হিজড়া সম্প্রদায় ও (অ)পুরুষত্ব

নাসরিন: কয়েকদিন আগে পত্রিকায় দেখলাম, সংসদেও আলোচনা হল যে হিজড়ারা ট্রাফিক সিগনালে উৎপাত করছে, টাকা পয়সা নিচ্ছে। তাই বলা হল তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এটাকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

আদনান: প্রথম কথা হল, আমাদের সমাজে একটা ভুল ধারণা তো রয়েই গেছে যে হিজড়া বলতে আমরা কি বুঝি। এই যে আপনি বলছেন ট্রাফিক সিগনালে বা রাস্তাঘাটে, বাসায় গিয়ে টাকা নেওয়ার বিষয়টিকে পাবলিক নুইসেন্স হিসেবে দেখা- এটার একটা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আছে। বিশেষ করে ব্রিটিশ আমলে করা ‘ক্রিমিনাল ট্রাইব অ্যাক্ট’ যা দিয়ে বৃটিশ প্রশাসন এটাকে ক্রিমিনালাইজ করে এবং পাবলিক নুইসেন্স হিসেবে দেখায় যে পাবলিক স্পেসে আপনি এটা করতে পারবেন না। পরবর্তীতে আইয়ুব খানও অল্প সময়ের জন্য এ’ধরণের একটা আইন করেছিল, হিজড়াদের প্রতিবাদের মুখে সেটা টেকেনি। তো পাবলিক নুইসেন্স হিসেবে এটার হিস্টোরিকাল একটা ফ্রেমওয়ার্ক আছে। অতদূর না গিয়ে যদি এখনকার কথাই বলি তাহলে এটার একটা কালচারাল কনটেক্সট আছে। আইনি কাঠামোটা সবসময় এই কালচারাল কাঠামোর পাশাপাশি বয়ে গেছে।

কালচারাল কনটেক্সটা এইরকম যে আমাদের সমাজে ঐতিহাসিকভাবে বা প্রথাগতভাবে হিজড়াদেরকে একটা অতিজাগতিক শক্তি বা ক্ষমতা সম্পন্ন মানুষ হিসেবে ভাবা হত। যারা মানুষকে আশীর্বাদও দিতে পারে, অভিশাপও দিতে পারে। তাদেরকে মনে করা হত এক ধরণের কালচারাল পারফর্মার। সমাজে বিশেষ কিছু ভূমিকা আছে তাদের। যেমন, বাচ্চাদের বাচ্চা নাচানো বা আশীবার্দ করা, নতুন বিবাহিতদেরকে আশীর্বাদ করা; এই ধরণের যে ফার্টিলিটি কাল্ট অর্থাৎ নবজাতক কেমন হবে না হবে বা নব বিবাহিতদের ফার্টিলিটিটা যেন ঠিক থাকে এ’সবে হিজড়াদের কালচারাল পারফর্মিংয়ের রোল আছে সেরকম একটা বিশ্বাস আমাদের সমাজে ছিল।

কিন্তু সাম্প্রতিককালে এই বিশ্বাসটা আস্তে আস্তে চলে গেছে। মূল সমস্যা হল বিশ্বাস ও বাস্তবতার মধ্যে একটা ফারাক তৈরী হয়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে হিজড়াদের বিশেষ ক্ষমতার যে বিশ্বাস সেটা এখন নাই-ই বলতে গেলে। কিন্তু হিজড়ারা কিন্তু এখনো পর্যন্ত ঐ বিশ্বাসটা আঁকড়ে ধরে আছে। তারা মনে করে তাদের ইন্সটিটিউশনটা আছে, এবং তার মধ্য় দিয়ে তারা তাদের হিজড়াত্বটাকে বা হিজড়াগিরি বা হিজড়ানেসকে এসার্ট করছে। তো এই গ্যাপটা আমাদের বুঝতে হবে। এটা এমন নয় যে হঠাৎ করে তারা টাকা তুলছে। এটার একটা প্রেক্ষাপট আছে। আরেকটা দিক হচ্ছে মর্ডানাইজেশনের ফলে পপুলার কনসেপচুয়ালাইজেশন অব হিজড়া এ্য়াজ স্য়াক্রোসেন্কট এইটা এখন আর নাই। এখনকার পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে আমরা মনে করতেছি যে তারা ডিজেবল। বা তাদেরকে ডিসফিগারড ধরণের মানুষ বলে ভাবা হচ্ছে। যদিও ডিজেবল বা ডিসফিগারড ধারণাগুলোর মধ্যেও একটা পার্থক্য আছে। কিন্তু ২০১৩ সালের রিকগনাইজেশনের পরে এই পার্থক্যটাও তুলে দেয়া হয়েছে।

আরেকটা বিষয় বলা দরকার। যেটাকে সাধারণভাবে উৎপাত, টাকা তোলা বা ছিনতাই হিসেবে দেখা হচ্ছে হিজড়ারা কিন্তু এটাকে এই ফ্রেমওয়ার্কে দেখছে না। এটার একটা কালচারাল কনটেক্সট আছে এটা আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। হিজড়াগিরি একটা লাইভলিহুড। তবে এটাকে শুধুমাত্র লাইভলিহুড হিসেবে দেখলেও চলবে না। এটার সাথে অনেক কিছু জড়িত। কিন্তু এটাকে যদি একটা ইকনমিক ইউনিট হিসেবেও দেখি তাহলে দেখবো এটার একটা জুরিসডিকশন আছে। পুরো ঢাকা শহরটাকে যদি একটা অঞ্চল হিসেবে ধরি তাহলে এই অঞ্চল বিভিন্ন হিজড়াদের মধ্যে বিভক্ত। এটাকে হিজড়ারা বলে বিরিত। এর মানে রিচুয়াল জুরিসডিকশন। এর ভেতরে আপনি অপারেট করতে পারবেন, তার বাইরে না। এর বাইরে যদি করেন তাহলে সেটাকে বলে বিরিত বাখর অর্থ্যাৎ আপনি চুরি করছেন। কিন্তু মানুষ সাধারণত যে অর্থে এই টাকা তোলাকে ছিনতাই মনে করে তারা তা মনে করে না, তারা মনে করে এটা হিজড়াগিরি। তারা যেহেতু আশীর্বাদ করতে পারে, একটা সার্ভিস দিচ্ছে যা ঐতিহাসিকভাবেই দিত, সেই স্পিরিচুয়াল সার্ভিসের এক্সচেঞ্জ হিসেবেই তারা এই টাকা তোলার ব্যাপারটাকে দেখে।

আমাদের এখানে দানের যে সামাজিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপট সেখানে একটা এনটাইটেলমেন্টের কনসেপ্ট আছে। কেউ যখন টাকা চাচ্ছে বা ভিক্ষা চাচ্ছে তখন সে মনে করছে আপনার সম্পদের একটা অংশে সে এনটাইটেলড বা তার তাতে হক আছে। শুধু হিজড়া না সকলেই এটা মনে করে। যদিও হিজড়াদের ব্যাপারটা ভিন্ন, তারা অন্য আর দশজন সাধারণ গরীব ভিক্ষুকের মত না। যেহেতু সামাজিক-সাংস্কৃতিকভাবে তাদেরকে মনে করা হত বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন ফলে এক ধরণের পাওয়ার তাদেরকে সামাজিকভাবে দেওয়া ছিল।

দান-খয়রাতের যে প্রচলিত সামাজিক ব্যবস্থা বা চিন্তা কাঠামো তার বাইরে ভাবতে পারবো না আমরা। যে চাচ্ছে সে বলছে আমাকে দাও, কিন্তু যে দিচ্ছে সে হয়ত ভাবছে আল্লাহ তার বালা-মুছিবত কিছু একটা দূর করে দেবেন। হিজড়াদের ব্যাপারটাও এই ফ্রেমওয়ার্কের বাইরে না। ফলে আপনি তাকে যা দিচ্ছেন বিনিময়ে সে ফার্টিলিটি দিচ্ছে, আশীর্বাদ দিচ্ছে ছেলেমেয়ে যেন বিকলাঙ্গ না হয়। ফলে এই কনটেক্সটের বাইরে গিয়ে যদি দেখি হঠাৎ করে হিজড়ারা আসছে, টাকা তুলছে তাহলে আমরা কিছু কিছু ইন্টারেস্টিং কালচারাল ইনসাইটকে মিস আউট করব এবং ব্যাপারটাকে বুঝতে পারব না। একটা দলকে নিয়ে যদি আমরা কিছু করতে চাই তাহলে তাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটটা আমাদের বুঝতে হবে।

ছবি: ঢাকা-ময়মনসিংহ ট্রেন লাইনের পাশে একদল হিজড়া অপেক্ষা করছিলেন। তাঁদের মাঝে একজন নিজের মোবাইল চেক করছেন। চিত্রগ্রাহক: নাসরিন সিরাজ। ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৫।

নাসরিন: তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে হিজড়াদেরকে যে স্বীকৃতি দেয়া হল, স্বীকৃতি দেয়ার মধ্য দিয়ে কি করল ব্যাপারটা, আপনার মতে?

আদনান: প্রথমত, তৃতীয় লিঙ্গ মানে কী সেটা বুঝতে হবে। এই স্বীকৃতির একটা বড় সমস্যা হল এটা একটা ভুল স্বীকৃতি। আমি বলব এই স্বীকৃতিটা ক্ষতিকারক। আমি হয়ত এটাকে সম্পুর্ণ ভিন্নভাবে দেখছি। এই যে স্বীকৃতি আর তার যে ফ্রেমওয়ার্ক তাতে কিন্তু আসলে হিজড়া হিসেবে আমরা যাদেরকে দলবদ্ধভাবে দেখি তাদের স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। বরং এখানে একটা নতুন ধরণের হিজড়ার সংজ্ঞায়ন করা হয়েছে। এখানে অনেকগুলো সমস্যা আছে অন মালটিপল লেভেলস। যেমন, প্রশাসন একটা ডেফিনেশন তৈরী করেছে। এই ডেফিনেশনের সাথে যদি আপনি করেসপন্ড করতে না পারেন তাহলে আপনি হিজড়া না। মানে, এটা একটা নতুন ধরণের রেজিম তৈরি করেছে যার মধ্য দিয়ে জেন্ডার টেস্টিং এ প্রমাণ করতে হবে আপনি হিজড়া কি হিজড়া না। এই মতে, হিজড়া হচ্ছে সেই যার মধ্যে লৈঙ্গিক বা যৌনতার ক্ষেত্রে কোন বিকলাঙ্গতা আছে। তার মানে এখানে হিজড়াদের আভিধানিকভাবে বা ডিকশনারী মেনে দেখা হচ্ছে। কিন্তু হিজড়াদের যদি দলবদ্ধ হিসেবে আমরা দেখি তাহলে বিষয়টা এর থেকে আরো অনেক বেশী জটিল। এটা বরং একটা কাউন্টার কালচারাল ফরমেশন বা সাব-কালচার ফর্মেশন। বাংলায় কি বলা যায়…

নাসরিন: পাল্টা সংস্কৃতি, ঠিক নরমাল সংস্কৃতি না।

আদনান: ঠিক তাই। সুন্দর। থ্যাংকিউ। এই কাউন্টার কালচারটা কিভাবে আবির্ভূত হয়েছে? মেইনস্ট্রিম কিছু কিছু বিশেষ ধরণের মানুষকে তাদের ভেতর থেকে বের করে দিয়েছে। যে তারা মেইনস্ট্রিমের অংশ না। তারা কারা? যারা মূলত জন্মগতভাবে বাহ্যত পুরুষের লৈঙ্গিক বৈশিষ্ট নিয়ে জন্ম নিয়েছে কিন্তু পুরুষ হওয়ার জন্য সামাজিক যে নীতিমালা বা সোসালি স্যাংশনড প্রটোকলসে কোন ব্যাত্যয় বা বিচ্যুতি ঘটিয়েছে তখন তাদের বলা হচ্ছে হিজড়া। পুরুষ হওয়ার জন্য সাফিশিয়েন্টলি, এডেকোয়েটলি যেই আচরণগুলো করার কথা, এটা হচ্ছে জেন্ডার পুলিসিং এর জন্য়, তা তারা পর্যাপ্তভাবে করছেন না। এটা হচ্ছে প্রাত্যহিক জীবনে হিজড়া শব্দের যে ব্যবহার সেটা।

নাসরিন: আমাকেও মাঝে মাঝে রাস্তায় লোকে হিজড়া বলে ডাকে। মেয়েরা যদি ছেলেদের মত চুল কাটে বা মেয়েলিভাবে না হাঁটে তখন অনেকে বলে যে মেয়েটা হিজড়ার মত করছে।

আদনান: সেটা আছে। তবে সংজ্ঞার দিক দিয়ে আমি বলবো হিজড়াটা শুধুমাত্র ছেলেদের জন্য প্রযোজ্য়। মেয়েদের ব্যাপারটাকে অন্যভাবে দেখা হয়। যেমন, মনে করা হয় ওরা অধিকার চায়, ছেলেদের মত সমাজে সুপিরিয়র পজিশন চায়, ইত্য়াদি। এইটাও লিঙ্গের আলোচনায় ইন্টারেস্টিং পয়েন্ট।  

আমি যেটা বলছিলাম এই প্রতিষ্ঠানটা কিভাবে আসলো। আমাদের বুঝতে হবে পাল্টা সংস্কৃতিটা এসেছে এবং তারা অ্যাকোমোডেট করছে সেইসব লোকজনদেরকে যারা সমাজে নরম্যাটিভ মাসকুলিনিটির ধারণাকে রিজেক্ট করছে। আরেকটা জিনিস মনে রাখতে হবে, এটা একটা ক্লাস স্পেসিফিক সাব কালচার বা ক্লাস স্পেসিফিক কাউন্টার কালচারাল ফরমেশন। এটা এক্রোস দ্য ক্লাস ঘটছে না। আপনি যদি শুধুমাত্র নিম্নবিত্ত বা গরীব ঘরে জন্মগ্রহণ করেন তাহলেই শুধুমাত্র হিজড়া হবেন, মধ্যবিত্ত হলে হিজড়া হবেন না। এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। তো, বাংলাদেশে হিজড়ার ক্ষমতায়ন, যদিও আমি কথাটা পছন্দ করি না একদমই, তবুও তর্কের খাতিরে যদি বলি যে এদেরকে আপনি রিহ্য়াবিলিটেশন বা পুনর্বাসন করতে চান, যদিও পুনর্বাসনের নামে এদের আসলে নির্বাসনই করা হয়েছে, এখানে হিজড়াদেরকে কাঠামোগতভাবে ভাবতে হবে। কাঠামোগত সমস্যার সাথে এটা যুক্ত। এটা কাঠামোগতভাবে ক্লাস কালচারাল পলিটিক্সের সাথে এমবেডেড বা প্রথিত। শুধুমাত্র যৌনতা ও লৈঙ্গিক ব্যত্যয়ের জন্য কেউ কাউকে হিজড়া বলে গালি দিচ্ছেন না; বরং এটা একটা নির্দিষ্ট শ্রেণির সাথে যুক্ত ব্য়ত্য়য় বা ট্রান্সগ্রেশন বলেই এটাকে আপনি এমন খারাপভাবে দেখছেন। যেমন, ওরা ওয়ার্কিং ক্লাসের মত চলাফেরা করছে, তাদের মেকাপ, পোশাক – অর্থ্যাৎ, হিজড়া শব্দটার মধ্য় দিয়ে ঐ সবই, মানে একটা ক্লাসের এসোসিয়েশনকে ইভোক করা হচ্ছে। একটা অর্গানাইজড গ্রুপ হিসেবে আমরা সমাজে যখন হিজড়াদের দেখি সেটাকে একটা ক্লাস কালচারাল ফর্মেশন হিসেবে দেখতে হবে এটা একটা ইম্পোর্টেন্ট পয়েন্ট। অথচ, আমরা সমসময় এটাকে বায়োলজি ফ্রেমওয়ার্কে দেখি। কিন্তু শরীরি বা জৈবিক ফ্রেমওয়ার্ক থেকে বের হয়ে এসে এটাকে আমাদেরকে দেখতে হবে সামাজিক স্ট্রাকচারাল কনটেক্সটে।

নাসরিন: কিন্তু অনেকে বলে যে ও হিজড়া হিসেবে জন্ম নিয়েছে তাই হিজড়ারা এসে ওকে নিয়ে গেছে…

আদনান: এটা সম্পুর্ণ একটা ভ্রান্ত ধারণা। আমার ১৮ বছরের গবেষণায় আমি এরকম কোন এভিডেন্স পাইনি। এমনকি যারা বাংলাদেশ-পাকিস্তান-ইন্ডিয়ায় সিরিয়াস গবেষণা করেছে কারো কোন গবেষণাতেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং তারা নিজেরা যায়। যখন তারা উঠতি বয়সী হয়, ১০/১২ বছর বয়স হলে যখন তারা দেখে পরিবার থেকে তাকে গ্রহণ করা হচ্ছে না, মারা হচ্ছে, স্কুলে গেলে বকা দেওয়া হচ্ছে, এলাকাতে খারাপ ব্যবহার করা হচ্ছে। বাহ্যিকভাবে সে ছেলে হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছে কিন্তু সে মেয়েদের মত শাড়ি, সালোয়ার কামিজ পরতে চাচ্ছে, লিপস্টিক-মেকাপ দিতে চাচ্ছে কিন্তু তাকে সেটা করতে না দিয়ে অত্যাচার করা হচ্ছে। সে যা হতে চাচ্ছে তাকে তা হতে দেওয়া হচ্ছেনা। তখন অত্যাচারের মুখে একটা পর্যায়ে সে পরিবার ছেড়ে চলে যাচ্ছে। বাবা মা ওদেরকে দিয়ে দিচ্ছে বা হিজড়ারা ধরে নিয়ে যাচ্ছে এটা সম্পুর্ণ বাজে কথা।

আরেকটা মিথ আছে, ওদের প্রচলিত একটা প্রথা ‘বাচ্চা নাচানো’ বিষয়ে। যে ওরা বাচ্চা দেখতে যায়, লিঙ্গ দেখে, যদি দেখে কোন দ্ব্যর্থকতা বা এ্য়ামবিগিউইটি আছে তাহলে বাচ্চাটা নিয়ে যায়, এটাও ভুল। ফলে এই আলোচনাটা খুব জরুরি যে হিজড়া বলতে আমরা কি বুঝি। আপনি যদি যে কোন বাংলা ডিকশেনারী দেখেন, একটা অর্থ দেওয়া আছে লৈঙ্গিক দ্ব্যর্থকতা; অর্থ্যাৎ লিঙ্গ দেখে আপনি যে নির্ধারণ করছেন ছেলে বা মেয়ে, সেই ক্ষেত্রে কোন দ্ব্যর্থবোধক পরিস্থিতি হলে তখন আমরা হিজড়া বলছি। আরেকটি শব্দ- নপুংসক, বা, ইংরেজিতে ইম্পোটেন্ট। মূলত এই দুইটা শব্দ। আমাদের ইন্টেলেকচ্যুয়াল কালচারাল ফ্রেমওয়ার্কে অনেক সময় এই শব্দ দুটোর মধ্য পার্থক্য করা হয় না। কিন্তু আসলেই যদি শব্দ  দুটোর মধ্যে পার্থক্য করি তাহলে দেখব নপুংসক মানে যে কোন পুরুষ লোক যার লৈঙ্গিক উত্থানে সমস্যা বা যৌন মিলনে ব্যর্থ হচ্ছে। কিন্তু তাদেরকেও আমরা হিজড়া বলি। অর্থ্যাৎ মাসকুলিন ডেফিসিয়েন্সির ডমিন্যান্ট ফ্রেমওয়ার্ক দিয়ে এখানে হিজড়াদেরকে দেখা হচ্ছে। এটা গেল ডিকশেনারী বা মেইনস্ট্রিম সোস্যাল কনসেপচুয়ালাইজেশন। এই এ্য়াঙ্গেল থেকে বের হয়ে আপনি যদি , যেটাকে আমি বলতে চাচ্ছি কাউন্টার কালচারাল ফর্মেশন, এর মাধ্য়মে তাদের সংজ্ঞায়ন করেন, তাদের নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গীতে তাদেরকে দেখেন তাহলে দেখবেন অনেক কিছুই অন্যরকম। সেই এ্য়াঙ্গেলের সব আলোচনা এখন করা সম্ভব না। ওদের ফ্রেমওয়ার্কে ওরা কিন্তু রিকগনাইজ করে যে হিজড়ার অর্থ কী। এবং ওরা কিন্তু বোঝে যে সমাজ হিজড়াকে এইভাবে ব্য়াখ্য়া করে। এবং এটাকে কিন্তু ওরা ওদের এডভান্টেজে ব্যবহার করে ঐতিহাসিকভাবে, একটা কৌশল হিসেবে, এই এ্য়ামবিগিউইটি বা লৈঙ্গিক দ্ব্যর্থকতাকে। তারা জানে সামাজিকভাবে এইভাবে হিজড়াদেরকে ভাবা হচ্ছে।  কিন্তু আসলে যারা লৈঙ্গিক দ্ব্যর্থকতা নিয়ে আসছে তারা হিজড়া না।  

তাহলে হিজড়া কারা? একটা হল আভিধানিক অর্থ। সেটাকে তারা একটা ক্য়াটাগরি হিসেবে রেকগনাইজ করছে। আরেকটা হচ্ছে, মনে করুন আপনি বাহ্যিকভাবে পুরুষের লিঙ্গ নিয়ে জন্ম গ্রহণ করেছেন। মানে আপনার শিশ্ম আছে, অন্ডকোষ আছে এবং সেগুলো ফাংশানাল। এখন, আপনি সেটাকে কেটে ফেলে দিতে পারেন। এটারও অনেক কনটেক্স আছে। আরেকটা হচ্ছে আপনার লিঙ্গ এবং অন্ডকোষ রয়ে গেল, তারপরও আপনি হিজড়া। মূলত এই দুটোই হচ্ছে ডমিন্যান্ট ধরণ যদি আপনি শরীরটা বুঝতে চান। তাহলে প্রশ্ন হল কেন একজন কেটে ফেলতে চাচ্ছে যেখানে কেটে না ফেললেও সে হিজড়া থাকছে? এটার ব্যাখা আছে। সহজভাবে তিনভাবে বলা যায়, ধরেন কেউ বাহ্যিকভাবে মেয়ে হিসেবে জন্ম নিলো কিন্তু বড় হয়ে তার ঋতুস্রাব হল না। তাহলেও কিন্তু সে হিজড়াদের দলে যায় না। বাইরে থেকে মনে হতে পারে হিজড়ারা অল সেক্সুয়াল এ্য়ামবিগিউইটি ইনক্লুড করছে। কিন্তু বাস্তবে তা না। শুধুমাত্র পুরুষের দেহ নিয়ে যারা জন্মগ্রহণ করছে তারাই হিজড়াদের দলে যায়।

দ্বিতীয় বিষয় হল, লিঙ্গ কেটে ফেলাটাকে কাউন্টার কালচারাল ফরমেশনে দেখা হচ্ছে একটা স্যাক্রিফাইস হিসেবে। আপনার যদি লিঙ্গটা না ই থাকে তাহলে আপনি কী স্য়াক্রিফাইস করবেন। হিজড়াদের দলে ঢোকার জন্য আপনাকে এই স্যাক্রিফাইসটা করতে হবে, যদিও সবাইকে লিঙ্গ কাটতেই হবে তা না। কিন্তু এটা একটা ইম্পর্টেন্ট বিষয়। আপনি যদি ইন্ডিয়ার হিড়জাদের দেখেন সেখানে এটা ক্লিয়ার যে আপনার হায়ারার্কিটা, গ্রেডেশনটা নির্ভর করছে আপনার এই স্যাক্রিফাইসের ওপর। যখন আপনি লিঙ্গ কেটে ফেলছেন তখন আপনি বেশি রেস্পেক্টেবল, বেশি কমান্ড করতে পারছেন; অন্যরা কম পারছে। আমি আমার লেখাতে এটা কনটেক্সচুয়ালাইজ করেছি যে বাংলাদেশে এটা ভিন্ন। ইন্ডিয়ান কনটেক্সটে এই চিত্রটা আরো কমপ্লিকেটেড। লিঙ্গ আছে আর লিঙ্গ নাই দুজনের মধ্যে অবশ্যই রেশারেশি আছে কিন্তু হিজড়াগিরিকে যদি একটা পেশা হিসেবে দেখি তাহলে এটাকে চালিয়ে নেবার জন্য দুজনকেই প্রয়োজন। কারণ তাদের অনেক রিচুয়াল আছে যা পালনের জন্য দুই ধরণের মানুষকেই প্রয়োজন। কিন্তু বাইরের সমাজের পারসেপশন যে হিজড়া মানে তার কিছুই নেই। বাইরের পারসেপশনের কারণেও ইন্টার্নালি তাদের মধ্যে অনেক টেনশন তৈরি হয় যে তোমার আছে, তোমার নাই ইত্যাদি। যদিও দুইজনেই রিচুয়ালি স্যাংশনড হিজড়া, কেননা কিছু কিছু রিচুয়াল, নিয়ম কানুন তাদের আছে যা পালনে লিঙ্গ থাকতে হবে। তো যাদের লিঙ্গ আছে এই ধরণের হিজড়াদেরকে বাংলাদেশে বলা হয় জানানা। আর যারা হিজড়া উইদাউট পেনিস তাদেরকে বলা হয় ছিবরি। আর যারা মায়ের পেট থেকে জেনাইটাল এ্য়ামবিগিউটি বা লৈঙ্গিক দ্ব্যার্থকতা নিয়ে জন্মেছে তাদেরকে বলা হয় ভাবরাজের ছিবরি। এটা কালচারালি, লিঙ্গুইস্টিকেলি মার্কড ইভেন উইদিন দেয়ার কাউন্টার কালচারাল ফর্মেশন। মার্কড কিন্তু ওদের অংশ না। এটা আমাদের বুঝতে হবে।

কারণ, পৃথিবীতে এখন ইন্টারসেক্স মুভমেন্ট ব্যাপকভাবে দেখা যাচ্ছে। ইন্টারসেক্স বলতে বুঝাচ্ছি যে হিজড়া বলতে প্রথাগতভাবে আমরা যেটা বুঝি যে তারাই হিজড়া যারা লৈঙ্গিক দ্ব্যার্থকতা বা এ্য়ামবিগিউইটি নিয়ে জন্মেছে। এখন তাদেরকে বলা হচ্ছে ইন্টারসেক্স। ইন্টারসেক্স মুভমেন্ট এখন গ্লোবাল নর্থে এবং ইস্টে ব্য়পকভাবে দেখা দিয়েছে। তার কারণে এখন দেখা যাচ্ছে ইন্টারসেক্স গ্রুপরা সামনে এগিয়ে আসছে এবং বলছে যে আমরা কিন্তু হিজড়া না। হিজড়া ফ্রেমওয়ার্ক থাকার ফলে, হিজড়াদের সাথে আমাদের ইন্টারসেক্সদের মিলিয়ে ফেলায় না হচ্ছে হিজড়াদের উপকার না হচ্ছে ইন্টারসেক্সদের। এটা আমরা যারা বাইরে থেকে গবেষণা করছি তারা বলছি না, যারা ইন্টারসেক্স গ্রুপ তারাই এটা বলছে। আন্দোলনের এই অগ্রগতিটা আমাদের বুঝতে হবে।

প্রথাগতভাবে ইন্টারসেক্সুয়ালিটির লেজিটেমেসি আমাদের সমাজে ছিল। মনে করা হত যে, জন্মগতভাবে যদি আপনার একটা অবস্থা হয় তাহলে সেটাকে কেন্দ্র করে কাজ করলে, ক্যাম্পেইন করলে ঠিক আছে কারণ এখানে চয়েসের কোন বিষয় নাই। কিন্তু যখন এটা চয়েসের বিষয় হিসেবে আপনি বলছেন তখন এটার কালচারাল ভ্য়ালিডিটি, কালচারাল লেজিটিমিসি কমে যাচ্ছে। এইসব কারণেই হয়ত হিজড়ারা এটাকে এম্ফেসাইজ করছে। কিন্তু এখন এ’টা এমন পর্যায়ে চলে এসেছে যে এই গলিয়ে মিশিয়ে ফেলাগুলো যে প্রবলেম্য়াটিক সেটা বোঝা যাচ্ছে। যেমন, ২০১৪ সালে সরকার হিজড়াদের চাকরি দেবার প্রজেক্ট হাতে নেয়। প্রেজক্টটা বাতিল হল কারণ মেডিকেল টেস্টে বলা হল তারা সবাই পুরুষ কারণ তাদের পুরুষাঙ্গ আছে। একজন ছিল যার লিঙ্গ ছিল না। তাকে বলা হল ফেইক হিজড়া। কেন? কারণ সে সার্জিকালি রিমুভ করেছে। সার্জিকালি রিমুভ করলে সে ফেইক হিজড়া, যাদের পেনিস বা পুরুষাঙ্গ আছে তারা প্রকৃত হিজড়া না – এইসব ভুল ধারণা থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। 

একটা কথা না বললেই নয়। অরুন্ধতী রায়ের দি মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস বইয়ে একটি হিজড়া চরিত্র আছে যা খুবই ভুলভাবে উপস্থাপিত। যদিও তিনি একজন নামকরা লেখক কিন্তু হিজড়া নিয়ে তাঁর গবেষণা ভুল, বা তিনি ঠিকমত গবেষণা করেন নাই। ইন্ডিয়ায় ইন্টারসেক্সগ্রুপদের একটি দল কিন্তু এর প্রতিবাদ জানিয়ে পরিবর্তন করতে বলেছে। সাউথ এশিয়ায় হিজড়াদের সংস্কৃতি হাজার বছরের, সেটা পাবলিক কালচারের একটা অংশ। ইন্ডিয়াতে ইন্টারসেক্স মুভমেন্ট সেই তুলনায় নতুন, এদের বয়স ১০ বছর। তারা বলছে এই যে আমাদের ১০ বছরের যা অর্জন তা এই বইটা এক স্ট্রোকে নাই করে দিল। ভিন্ন ভিন্ন ধরণকে মিলিয়ে গুলিয়ে এক করে দিল। আমাদের এইখানে এই কালচারাল কনফ্লেশনের একটা ব্যাপার আছে। মানে, আমাদের সাউথ এশিয়ান কালচারাল কসমোলজি বা ইন্টেলেকচুয়াল ফ্রেমওয়ার্কে,যদি ব্রডলি ফ্রেমওয়ার্ক বলি আর কি, যে ফ্রেমওয়ার্কের ভেতর আমরা হিজড়াকে ভাবি সেই ফ্রেমওয়ার্কে অনেক কনট্রাডিকটরি বিষয়কে একটার সাথে আরেকটাকে মিলিয়ে দেখা হয়। অনেক সময় এগুলা কন্ট্রাডিকটরি মনে হলেও একই সাথে সবগুলো ডিসকোর্সই কোর ডিসকোর্সে রয়েছে হিজড়াকে ব্যাখা করার জন্য।

এটাকে এখন এক ধরণের শক্তি হিসেবে দেখা যেতে পারে প্রথাগতভাবে। অর্থ্যাৎ এদেরকে ডমিস্টিকেটেড করা যাচ্ছে না, কনটেইন করা যাচ্ছে না। এটা ক্লাসিফায়েবল না। কিন্তু ঐ ফ্রেমওয়ার্কটাও এখনকার পরিবর্তিত সামাজিক প্রেক্ষাপটে কাজ করছে না অনেক ক্ষেত্রে। সেটার আলাদা একটা ভ্যালু আছে ঐতিহাসিকভাবে। এখন ঐ অ্যামবিগিউইটির ফলে অনেক সমস্যা দেখা যাচ্ছে। সমস্যা হল তাহলে আমরা কি। আমরা কি ঐ এ্য়ামবিগিউইটি রেখে যাবো? হিজড়া বলতে একইসাথে বলব হোমোসেক্সুয়াল, ট্রান্সজেন্ডার, ইউনিসেক্স সব বুঝবো? এই যে জগাখিচুড়ি বা কালচারাল কনফিউশন যার প্রমাণ আপনি দেখতে পাচ্ছেন মেইনস্ট্রিম লেখার মধ্যে, যেমন মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস-এ।

সহজ হিসাবে যে হিজড়াগিরি করে সে হিজড়া। হিজড়াগিরি শিখতে হয়। বাইরের মানুষের কাছে আর সংঘবদ্ধ দলের কাছে হিজড়ার সংজ্ঞা ভিন্ন। হিজড়াদের সংজ্ঞায় হিজড়াগিরি শিখতে হবে, তাদের মত পোশাক, শাড়ি পরতে হবে, নিজেদের মধ্যে নিজস্ব শব্দ ব্যবহার করতে হবে। নিজেদের ভাষা আছে একটা যেটা কাউন্টার কালচারাল ফর্মেশনের অংশ, সেটা জানতে হবে। এই বিষয়গুলো শেখার মধ্য দিয়ে আপনি হিজড়া হচ্ছেন। এটা একটা অর্জিত সাবজেক্ট পজিশন এটা মনে রাখতে হবে। এটা একটা প্রক্রিয়া, দীর্ঘ সময় ধরে একটা সংগবদ্ধ প্রক্রিয়ার মধ্য় দিয়ে গিয়ে এটা শিখতে হবে। গুরুর কাছে দীক্ষা নিতে হবে। এবং দীক্ষা নিয়ে পদে পদে অনেক কিছু শিখতে হবে। এটা অনেক এলাবোরেট। এই দীক্ষার উপর নির্ভর করবে কমিউনিটিতে আপনার স্ট্যাটাস কি। হিজড়া সম্প্রদায়কে ঘিরে বিভিন্ন বিষয়ে আপনার জ্ঞান কেমন। কিভাবে সংগবদ্ধ হবেন। কিভাবে টাকা ডিস্ট্রিবিউট করতে হয়, কিভাবে নিয়মকানুন মানতে হয়, কিভাবে সালিশ বিচার করতে হয়।  কিভাবে স্পিরিচুয়াল বা ধর্মীয় বিষয়গুলো পালন করতে হয়। হিজড়াগিরি করতে পারা মানে এই জিনিসগুলি করতে পারা।

আমাকে যদি জিজ্ঞেস করেন কি ধরণের শরীরের মানুষেরা হিজড়া হয়, তাহলে বলব বাহ্যত যে পুরুষের শরীর নিয়ে জন্ম নেয়, অন্ডকোষও থাকবে,পুরুষ লিঙ্গও থাকবে। এদের যে লিঙ্গ উত্থানে সমস্যা এগুলা সম্পুর্ণ  বাজে কথা। বরং হিজড়ারা পুরুষ হয়ে জন্ম নিয়েও অন্য দশজন পুরুষের মত আচরণগুলো করছে না, করতে পছন্দ করছে না।

নাসরিন: সেটা বায়োলজিকাল নাও হতে পারে

আদনান: না, সেটা বায়োলজিকালও হতে পারে। ডিপেন্ড করে বায়োলজি বলতে আমরা কি বুঝাচ্ছি। বায়োলজিও একটা ফিক্সড জিনিস না। এটাও একটা ভেরিয়েবল।

সামাজিকভাবে যাদের লিঙ্গ এবং বিচি থাকে আমরা আশা করি তারা সকলেই একভাবে চলবে, আচরণ করবে, পোশাক পরবে। এটা তো সামাজিকভাবে ইমপোজ করা। সবাই এটাকে কনফার্ম করছে না। কেউ যখন এটাকে কনফার্ম করছে না, অর্থ্যাৎ ছোট বেলায় মেইল জেন্ডার হিসেবে এসাইনড হয়েও বড় হয়ে যে এই জেন্ডারে কম্ফোর্টেবল না বা পারফর্ম করছে না। ইন্টারেস্টিং হচ্ছে, তাহলে তারা কি হতে চায়, এখানে অপশনটা কি। অপশনটা হচ্ছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা বলে আমরা নারীর মত বা পুরুষের মত হতে চাচ্ছিনা। আমাদের দেশে বা সাউথ এশিয়ার ক্ষেত্রে এই হিজড়া ফ্রেমওয়ার্কটাকে যদি লক্ষ করেন, এটা কিন্তু রুপান্তরকামী ফ্রেমওয়ার্ক না যে পুরুষ থেকে নারী হওয়া; অর্থ্যাৎ ট্রান্সসেক্সুয়াল না। এর সাথে সিগনিফিকেন্ট পার্থক্য আছে। এটাও এক ধরণের রুপান্তরকামীতা, কিন্তু ট্রান্সসেক্সুয়ালিটির যে রুপান্তরকামীতা অর্থ্যাৎ আপনি পুরুষ থেকে নারী বা নারী থেকে পুরুষে রুপান্তরিত হচ্ছেন থ্রু সার্জারি। সার্জিক্যালি আপনি শরীরকে রিএলায়েন করতেছেন। নিজেকে যেটা ফিল করেন আপনি, অর্থ্যাৎ জেন্ডার রিঅ্যাফার্মেশন সার্জারী। হিজড়াদের ক্ষেত্রে বিষয়টা ভিন্ন, এখনও পর্যন্ত প্রথাগতভাবে সে মেইল থেকে নন-মেইল একটা স্টেটে যাচ্ছে। পুরুষাঙ্গ কেটে ফেলে সেখানে একটা ভ্যাজাইনা চায় না। এখন হয়তো চেঞ্জ হতে পারে, কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে এবং এখন পর্যন্ত যদি দেখেন, ইটস ভেরি ডিফারেন্ট ফ্রেমওয়ার্ক, ট্রান্সসেক্সুয়ালদের সাথে কনফিউজড করার জায়গা নেই।

অনেক অনেক শব্দের ব্যবহার এখানে। একেকটা শব্দের একেকটা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আছে, একটা শব্দ তো হঠাৎ করে আসে নাই। একেকটা পার্টিকুলার কনটেক্সটে একটা শব্দের উদ্ভব হয়। তখন শব্দটা কনটেক্সটে গ্রো আপ করে, কনটেক্স থেকে ট্রাভেল করে; তখন শব্দটা নতুন অর্থ নেয় অনেক ক্ষেত্রে। আগের অর্থও থাকে, নতুন অর্থও নেয়। বা নতুন প্রেক্ষাপটে যখন যায় সেখানেও মিথস্ক্রিয়া হয়। সেই মিথষ্ক্রিয়ার বা ইন্টারাকসনের সময় পুরোনো কিছু অর্থ হারায় নতুন  কিছু অর্থ তৈরী হয়। যেমন ট্রান্সজেন্ডার বলতে বোঝানো হচ্ছে যারা জেন্ডারকে ট্রান্সসেন্ড বা অতিক্রম করছে, অর্থ্যাৎ আমরা জেন্ডার বলতে যা বুঝি নারী-পুরুষ তার বাইরে যাচ্ছে। অথবা ট্রান্সগ্রেস করছে। কিন্তু আমাদের এখানে ট্রান্সজেন্ডার বলতে বুঝানো হয় শুধুমাত্র যারা হিজড়া। কিন্তু এটা আরো ব্রড ক্যাটাগরি। এইটা এখন ব্যবহার হচ্ছে, পার্টিকুলারলি এইচআইভি এইডস এবং এনজিও এবং গ্লোবালাইজেশন অব এনজিও, একটিভিটিজ এসবের সাথে সাথে এর কানেকশন আছে। পৃথিবীর আরো অনেক দেশের মত আমাদের দেশেও প্রথম যখন এইডসকে এড্রেস করার ব্যাপারটা আসলো তখন দেখা গেল এইরকমের জনগোষ্ঠী এসব ক্ষেত্রে বেশি রিস্কে; এইরকম এঙ্গেলের ইন্টারভেনশন থেকে যখন জিনিসটাকে দেখা হয় তখন দেখা গেল নতুন নতুন শব্দ চলে আসছে। সেই বিষয়েই ট্রান্সজেন্ডার শব্দটা আসছে। ট্রান্সজেন্ডার শব্দের সমস্যাগুলোর মধ্যে একটা হল এখানে একটা স্কেলের সমস্যা তৈরি হয়েছে। ট্রান্সজেন্ডার শব্দটা যখন ট্রাভেল করে এখানে এসেছে এটা একটা আধুনিকায়নের ফ্রেমওয়ার্ক নিয়ে এসেছে। ট্রেডিশনাল শব্দের নেতিবাচিক ব্যবহার আমরা বলতে পারি, প্রভিনশোনাল; হিজড়া শব্দটি এক্ষেত্রে ট্রেডিশনাল আর ট্রান্সজেন্ডার মডার্ন। এটা হচ্ছে শব্দের ব্যবহারের ট্রাভেলের সমস্যা। আবার ভাল দিকও আছে। অনেকে হয়ত নিজেকে এই শব্দের এরাউন্ডে নিজেকে অর্গানাইজ করতে পারছে। আত্মপ্রকাশের হাতিয়ার হিসেবে একটা শব্দ খুঁজে পাচ্ছে। বড় মাপে যদি দেখি, যারা হিজড়া হিসেবে নিজেকে ভাবতে চায় না তাদের আত্মপ্রকাশের জন্য তো একটা ফ্রেমওয়ার্ক লাগবে।

আরেকটা বিষয় হচ্ছে সমাজে হিজড়ারা একটা ননরেসপেক্টেবল গ্রুপ হিসেবে রয়েছে। মধ্যবিত্তের যে রেসপেক্টটিবিলিটির ফ্রেমওয়ার্ক সেটায় একটা নতুন সমস্যা দেখা দিয়েছে। হিজড়াদের মধ্যে একটা বিভাজন হয়েছে। কেউ বলছে আমি ট্রান্সজেন্ডার, হিজড়া না। অর্থ্যাৎ ট্রান্সজেন্ডার একটা রেসপেক্টেবল মোড অব সেলফ আইডেন্টিফিকেশন হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রথাগত হিজড়াগিরিটাকে নেগেটিভ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ আপনি দেখবেন, এখন অবসেশনই হচ্ছে কিভাবে আমরা এটাকে মেইনস্ট্রিম করতে পারি। মেইনস্ট্রিম মানে হচ্ছে স্বাভাবিক জীবন। স্বভাবিক জীবন মানে হচ্ছে সাধারণ আর দশজন লাইভলিহুড যেভাবে ম্যানেজ করে। কোন একটা কাজ বা চাকরী করার মাধ্যমে। অনেকেই হয়ত এনজিওর সাথে কাজ করছে এবং মনে করছে হিজড়াগিরিটা হচ্ছে নিচু ধরণের কাজ। ট্রান্সজেন্ডার শব্দটা এইরকম বিভাজন তৈরি করছে। শব্দের অর্থটার থেকেও কোন প্রেক্ষাপটে এটা ব্য়াবহার হচ্ছে এটা গুরুত্বপুর্ন। আপনাকে আমি তিনটা দিক বললাম। শব্দটার যদি ইউজটা বলেন আপনি এটা একটা পশ্চিমা বা আমেরিকান কনটেক্সটে পার্টিকুলারলি আবির্ভূত হয়েছে এবং কনসুলেটেড হয়েছে অ্যাজ এ মোড অব সেলফ আইডেন্টিফিকেশন হিসেবে। সবসময় ছিল না এই শব্দটা। ফিফটিজ-সিক্সটিজে কিন্তু ট্রান্সজেন্ডার শব্দটার অস্তিত্ব ছিল না, এই ব্য়াপারগুলো তো ছিলই না। আশি/নব্বই-এ যখন গ্লোবালাইজেশন হল, এনজিও এক্টিভিটিজ সারা পৃথিবীতে ছড়ালো এইডসকে কেন্দ্র করে, তখন পার্টিকুলারলি ভালনারেবল জনগোষ্ঠীকে, তাদেরকে ঘিরে এইডস সম্য়াটাকে এ্য়াড্রেস করার জন্য, সেই কনটেক্সটে শব্দটা এসেছে।

এটার একটা কনসেপচুয়াল কনটেক্সট আছে। সেটা  হল ওয়েস্টার্ন সেক্সোলোজি। এতো বিস্তারিত এখন বলার সময় নেই। সংক্ষেপে বললে সেটা হল এরকম, এলজিবিটি মুভমেন্ট যেটা আমরা বলি, যদিও এলজিবিটি বলারও সমস্যা আছে, কারণ এখানে আমরা একটা সলিডারিটি এজিউম করে নিই যেটা প্রকৃতপক্ষে এক্সিস্ট করে না। সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশন ও জেন্ডার আইডেন্টিটি এই দুটো ধারণা একধরণের ডিসটিলেশান দিয়েছে। মানে দুটোকে আলাদা করে দেখা। সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশনের যে কনসেপ্ট, অর্থ্যাৎ আপনি সেক্সুয়ালি কিসের প্রতি ওরিয়েন্টেড, ইরোটিকালি, যৌনতার ভিত্তিতে কিসের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন এর উপর ভিত্তি করে নিজেই নিজেকে যে আইডেন্টিটি দেওয়া সেটা হচ্ছে সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশন। আর জেন্ডার আইডেন্টিটি মানে এখনকার প্রেক্ষাপটে যেভাবে ভাবা হচ্ছে, আপনি নিজেকে কি মনে করছেন, পুরুষ নাকি নারী। এই যে দুটোকে আলাদা করে দেখা, অর্থ্যাৎ যৌনতা এক জিনিস আর জেন্ডার আইডেন্টিটি আলাদা জিনিস এই আলাদা করে দেখার বিষয়টাও কিন্তু নতুন। ওয়েস্টার্ন সেক্সুয়ালিটিতে এই আলাদাকরণ বরাবরই অনুপস্থিত ছিল। ওয়েস্টার্ন সেক্সুয়ালিটিতে একটা সময় মনে করা হত বাহ্যিকভাবে যারা পুরুষের শরীর নিয়ে জন্মায় কিন্তু নারীর মত ভাবে বা নারীর শরীর নিয়ে জন্মায় পুরুষের মত ভাবে তারাই সমকামী। এই ফ্রেমওয়ার্কটাই কিন্তু ঐ ডিসকোর্সের মধ্যে ছিল। পরবর্তীতে দেখা গেছে এই দুইটা কনসেপ্টের মধ্যে  একধরণের প্রোগ্রেসিভ ডিসোসিয়েশন হয়েছে। আজকে আবার দুটোকে সম্পুর্ণ আলাদা ভাবে দেখা হচ্ছে। আমি বলছি পশ্চিমের প্রেক্ষিতে। যখন ট্রান্সজেন্ডার বলে তখন এটা জেন্ডারের বিষয়, এখানে যেন কোন ডিজায়ার নাই। আর যখন গে-লেসবিয়ান বলে তখন এটাকে শুধু সেক্সুয়ালিটির বিষয় হিসেবে ভাবে যেন এখানে কোন জেন্ডার ইস্যু নাই। এই রকমভাবে ভাবার একটা প্রবণতা এখন আছে। কিন্তু আসলে এই জিনিসগুলা খুবই কানেক্টেড। এই ভাগ করা ও দেখানো এক ধরণের ভুল। মানে দাঁড়াচ্ছে আজকের ফ্রেমওয়ার্কে একটা মানুষ একই সাথে গে এবং ট্রান্সজেন্ডার হতে পারে না। কিন্তু আসলে অবশ্যই পারে। কিন্তু ডমিন্যান্ট থিংকিংয়ে মনে করা হচ্ছে ট্রান্সজেন্ডার একটা সম্পুর্ণ জেন্ডারের বিষয় এবং গে-লেসবিয়ান সেক্সুয়ালিটির বিষয়। ফলে সমস্যা যেটা হয়েছে ট্রান্সজেন্ডার নিয়ে ভাবতে গেলে আমরা তাদের সেক্সুয়ালিটি বা ডিজায়ারের এলিমেন্টগুলো দেখছি না।

থার্ড জেন্ডারের বিষয়ে মনে হয় একটু কথা হওয়া দরকার। থার্ড জেন্ডারের অনেকগুলো বিষয় আছে। একভাবে ভাবলে ভাবা যায় যে এটা একটা কালচারাল ধারা। এটা একটা কালচারাল ক্যাটাগরি অব থার্ড যাকে আপনি লিগ্যাল ক্যাটাগরি অব থার্ড জেন্ডারে পরিণত করলেন। কথাটা বুঝতে হবে। এটা নিয়ে আমি একটা লেখা লিখেছি, প্যারাডক্স অব রিকগনিশন । রিকগনিশনের সমস্যা, কেন হল এই পুরো বিষয়গুলা আছে ঐ লেখায়। সামাজিকভাবে কিভাবে ভাবছি এবং  রিয়েলিটি কি এবং মানুষকে কিভাবে দেখানো হচ্ছে পলিসিমেকারদের দ্বারা যারা মনে করছে খুব ভাল কিছু হয়েছে।

একটা জিনিস মনে রাখতে হবে আমরা যখন তৃতীয় লিঙ্গ বলি মনে হয় যেন এটা প্রথম ও দ্বিতীয় লিঙ্গের সাথে ইক্যুয়াল ফুটিংয়ে আছে। অথচ প্রথম ও দ্বিতীয় বলার মধ্য দিয়ে আমরা অলরেডি একটা হায়ারার্কির অর্ডার বা স্তরবিন্যাস দেখতে পাচ্ছি, সামাজিক লৈঙ্গিক একটা স্তরবিন্যাস। একটা প্রথম লিঙ্গ থাকছে, একটা দ্বিতীয় লিঙ্গ থাকছে, একটা তৃতীয় লিঙ্গ থাকছে, অলরেডি একটা হায়ারার্কির অর্ডার, মনে রাখতে হবে এটা একটা ইক্যুয়াল ফুটিংয়ে না। তৃতীয় লিঙ্গ মানে এই না যে এটা একটা সেলিব্রেশন, ডাইভার্সিটি।

দ্বিতীয়ত, তাদেরকেই আমরা বাধ্য করছি তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে নিজেদেরকে আইডেন্টিফাই করতে যারা প্রথম বা দ্বিতীয় লিঙ্গ হতে ব্যর্থ হচ্ছে। অর্থ্যাৎ আইদার আপনি পর্যাপ্তভাবে প্রথম বা দ্বিতীয় হতে পারলেন না। বিষয়টা কিন্তু এমন না দিস ইস এ চয়েজ। যখন আমরা তৃতীয় লিঙ্গ নিয়ে কথা বলি ভাবখানা এমন যে একটা নতুন ডাইভার্সিটি দিলাম। কিন্তু একচুয়ালি এটা করার মধ্য দিয়ে প্রথম ও দ্বিতীয় লিঙ্গকে আরো বেশি রি-এনফোর্স করা হতে পারে। অর্থ্যাৎ আপনি ন্যাচারালাইজ করলেন যে এই দুইটা হচ্ছে ন্যাচারাল ক্যাটাগরিজ আর যারা এই দুটোকে কনফর্ম করতে পারছে না তাদেরকে আপনি তৃতীয় লিঙ্গ বলছেন। এটা বুঝতে হবে যে আমাদের যে এনথুজিয়াজম, সেলিব্রেশন, হ্য়াঁ, স্ট্রাটেজিক ইউজ অবশ্যই আছে, কিন্তু আমাদেরকে বুঝতে হবে তৃতীয় লিঙ্গটা কী। তৃতীয় লিঙ্গটাকে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে একটা রিডিকিউল লিমিনালিটি । এবং নট এ সেলিব্রেটেড ইন্টারস্টেটিসশিয়াল স্পেস। হ্য়াঁ, সেরকম একটা স্ক্রিপ্টচুয়াল ট্রেডিশন আমাদের এখানে আছে। মহাভারত বলেন বা রামায়ণ বলেন। কিন্তু সেই ট্রেডিশন আর বাস্তব জীবনের মধ্যে ডিফরেন্স আছে। রামায়ণ মহাভারতে লৈঙ্গিক দ্ব্যার্থকতাকে যেভাবে সেলিব্রেট করা হয়েছে বা মহিমান্বিত করা হয়েছে যখন তা বাস্তব জীবনে আসে তখন এর সোশাল রিয়াকশন অন্যরকম। ঐটা আমাদের মনে রাখতে হবে। কিন্তু এটা একটা লং ট্রেডিশন সাউথ এশিয়ান কনটেক্সটে আছে, এটা আপনি কামাসুত্রতেও পাবেন, পিপল অব দ্য থার্ড নেচার। যৌনতার ক্ষেত্রে যারা ভিন্ন ধরণের আচরণ করছে, প্রথাগতভাবে আমরা যাকে বলি বিসমকামীতা বা হেটারোসেক্স্যুয়ালিটি, এর থেকে আলাদাভাবে যা আসছে তাকে ভিন্নভাবে দেখছে। এইধরণের রিকগনিশন কিন্তু হিন্দু টেক্সটে, জৈন টেক্সটে ঐতিহাসিকভাবে আছে। সেটা আর আজকের থার্ডনেস এক না। থার্ডনেসেরও বিভিন্ন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বিভিন্নরকম কনটেক্সচ্যুয়াল মিনিং আছে। থার্ডনেসটা কেন এসেছে, কলোনিয়াল এনকাউন্টারে যুক্ত হওয়ার ফলে কি ধরণের থার্ডনেস এসেছে ওগুলো বুঝতে হবে। কলোনিয়াল এনকাউন্টার যখন হয় তখন আমরা সবাই হিজড়া হয়ে গেছি। ইন দ্য ডমিনেন্ট কলোনিয়াল ফ্রেমওয়ার্ক এ। যারা এসেছে কলোনি স্থাপন করতে তারা হয়ে গেছে পুরুষ আর আমরা সবাই এক ধরণের অপুরুষে পরিণত হয়েছি অন একাউন্ট অব বিয়িং কলোনাইজড। সেরকম বর্ডারেরও একটা ফ্রেমওয়ার্ক আছে। সেই ফ্রেমওয়ার্কে আমরা কিভাবে এটাকে ব্যবহার করব তার একটা বিষয় আছে।

যেমন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে গান্ধীর একটা কনসেপ্ট ছিল যে এ্য়ান্ড্রোজিনি। অর্থ্যাৎ ব্রিটিশদের যে একটা হাইপার ম্যাসকুলিন ইমেজ সেটাকে কাউন্টার করার জন্য আরেক ধরণের রিভিরিলাইজেশন অর্থ্যাৎ নতুন করে কিভাবে আবার ভারতীয়দের পুরুষ বানাতে পারেন বা কিভাবে রিমাসকুলিনাইজ করতে পারেন সেই স্ট্রাটেজিতে না গিয়ে গান্ধী প্রোটেস্ট করল একধরণের অ্যান্ড্রোজেনি দিয়ে। আবার অন্য় আরেক ধরণের সামাজিক আন্দোলন দেখা দিল যারা মনে করল, না শরীর দিয়েই আমাদেরকে এটা কাউন্টার করতে হবে। যেমন, রেসলিং, কুস্তি ফুটবলে ভাল করার মধ্য দিয়ে।

নাসরিন: গান্ধীর বিষয়টা জানিনা বলে বুঝতে চাচ্ছি। উনি কিভাবে বিষয়টা কাজে লাগিয়েছিলেন?

আদনান: যখন কলোনিয়াল এনকাউন্টার হয় তখন এটাকে আপনি কিভাবে পাঠ করবেন। এটার মধ্যে একটা জেন্ডার রিলেশন ও সেক্সুয়াল পলিটিক্স আছে। যারা কলোনাইজ করছে তাদেরকে হাইপার ম্যাসকুলিন রোলে ভাবা হচ্ছে। তারা সেইভাবে নিজেদেরকে এসার্ট করছে। আর যারা কলোনাইজড তাদেরকে মনে করা হচ্ছে এদের ম্যাসকুলিনিটি নাই। এরা সবাই একটা লস অব ম্যাসকুলিনিটি বা ম্য়ানহুডে আছে এজ এ কনসিকোয়েন্স অব বিয়িং কলোনাইজড। এই ফ্রেমওয়ার্কটাকে কিভাবে রিড করা যায়। গান্ধী যে ফ্রেমওয়ার্কটা প্রেজেন্ট করে সেটার রিডিংটা করা যেতে পারে এভাবে, ভায়োলেন্সকে কাউন্টার করার জন্য আপনি ভায়োলেন্সকে ব্যবহার না করে নন ভায়োলেন্সকে ব্যবহার করলেন। নন ভায়োলেন্সকে আপনি মনে করলেন মোরালি সুপিরিয়র। এটার একটা জেন্ডারড দিক আছে। অর্থ্যাৎ আপনি শরীরকে রিভিরিলাইজ করা। হাইপার ম্যাসকুলিন ব্রিটিশদের কাউন্টার করার জন্য কিন্তু অনেক কিছু এসেছে, একটা বললাম আখড়া/রেসলিং, খেলাধূলার ক্ষেত্রে পারফর্ম করা। মানে আপনি ম্যাসকুলিনিটিকে এসার্ট করছেন যেটা নেশনের সাথে কানেক্টেড থ্রু বডি। শরীরকে আপনি কিভাবে ব্যবহার করছেন। এই ব্যবহারের ক্ষেত্রে গান্ধী একটা অল্টারনেটিভ ফ্রেমওয়ার্ক দিল। হিজড়া আলোচনাটা এইসব ডিসকাশনের বাইরে করা যাবে না।

নাসরিন: যদি সামারাইজ করতে চাই,  আমরা তো জাতীয় সংসদে কিভাবে হিজড়াদের নিয়ে কথা হল সেটা দিয়ে শুরু করেছিলাম, আমার কাছে মনে হয় , যেটা আপনি বললেন তা হল, যারা হিজড়া তারা নিজেদেরকে কিভাবে দেখছে, ঐতিহাসিকভাবে কিভাবে হিজড়াগিরিটা আসলো বা হিজড়ারা কিভাবে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি চর্চা করছে- এগুলো না জেনে, না বুঝে হুট করে তাদের সম্পর্কে কোন কথা বলা বা সিদ্ধান্ত নেয়া যায় না।

আদনান: ঠিকই। আবার কাউন্টার কালচারাল রেসপন্স হিসেবে এটা তৈরি হয়ে সময়ে সময়ে কিন্তু শিফট হয়েছে বিভিন্ন সামাজিক চেঞ্জের ফলে। যখনই কিছু একটা আসে তখনই তাদের এডজাস্ট করতে হয়েছে।

স্বীকৃতি প্রসঙ্গে মনে হয় আরেকটা কথা বলা প্রয়োজন। স্বীকৃতিটা ভুল এই কারণে যেহেতু সে একটা পার্টিকুলার ডেফিনেশন ইমপোজ করছে। ওরা মনে করে যে এরা হচ্ছে যৌন ও লিঙ্গ প্রতিবন্ধি।

নাসরিন: পলিসি মেকারদের নিজেদের আবিষ্কার

আদনান: এই প্রতিবন্ধকতার ফ্রেমওয়ার্কটা একটা ডেঞ্জারাস ফ্রেমওয়ার্ক। ডিজ্যাবিলিটি হিজড়াদের ক্ষেত্রে কেন! পলিসিমেকারদের ঐরকম ধারনা থেকে। যার ফলে বাস্তবের সাথে একটা গ্যাপ দেখা যাচ্ছে। ফলে স্বীকৃত সংজ্ঞা বা ভাবনা অনুসারে যারাই সেখান থেকে সরে যাচ্ছে তারা আর হিজড়া না। মূল বিষয় যেটা দাঁড়ালো, রিকগনিশনের ফলে, আইনী দৃষ্টিভঙ্গীতে যারা আসলে হিজড়া তারাই আর হিজড়া না। আমার একটা লেখার শেষ লাইন- আন্ডার দিজ নিউ রেজিম অব রিকগনিশন হিজড়াস আর নো লংগার হিজড়াস। হিজড়াস আর নট এলাউড টু বি হিজড়াস এনিমোর।“

এ’খানে আরো অনেক সমস্যা আছে। ক্লাসের সমস্যা আছে, সিভিল সোসাইটি, গভর্নমেন্ট, এদের নেক্সাস। এরা কি করে, একটা প্রান্তিক গ্রুপকে সবসময় ব্যবহার করে, প্রোরাইটস ক্রিডেনশিয়ালস বুস্ট করবার জন্য। অর্থ্যাৎ, আমরা অনেক অধিকার সম্পন্ন, আমরা অনেক সচেতন, আমরা অনেক সংবেদনশীল – অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের আত্মতুষ্টি সুসংহত করার জন্য এরা হিজড়াদের ব্য়াবহার করে। একটা বড় সমস্যা হল আমাদের একটা সোশ্যাল রেসকিউ মডেল আছে। হিজড়াদেরকে নিয়ে কথা বলতে গেলেই আমরা মনে করি যে সেলভেজ করছি। এই ধরণের ফ্রেমওয়ার্ক থেকে বের হয়ে আসতে হবে।  এই ধরণের ফ্রেমওয়ার্ক হচ্ছে একটা ডিপলিটিসাইজিং ফ্রেমওয়ার্ক। পুরো বিষয়টাকে বিরাজনীতিকরণ করা হচ্ছে। ফলে এটাকে আমরা স্ট্রাকচারালি দেখতে পাচ্ছি না। হিজড়াদেরকে নিয়ে যে সামাজিক সমস্যা, তারা যে ভায়োলেন্সের শিকার, তারা যে অবহেলিত, পিছিয়ে পড়া এটাকে বোঝার জন্য আমাদেরকে স্ট্রাকচারালি দেখতে হবে। স্ট্রাকচারের সমস্যাটা হল এটা জেন্ডার রিলেশনের সাথে এসোসিয়েটেড, ক্লাস পলিটিক্সের সাথে কানেক্টেড, গ্লোবাল ইনইকুয়ালিটির সাথে কানেক্টেড। এর বাইরে গিয়ে ভাবলাম, এরা শারিরীক ভিন্নতা নিয়ে জন্মেছে, ওদের একটা দোকান করে দিলাম, বিউটি পার্লার করে দিলাম, যার মধ্য দিয়ে আমরা আত্মতুষ্টি ভোগ করতে পারছি। এটা কোন সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। মূল যে কাঠামোগত সমস্যা সেখানে হাত দেওয়া হচ্ছে না। রিকগনিশনটাকে অনেকে হয়ত পজিটিভলি দেখে যে এট লিস্ট একটা স্বীকৃতি দিয়েছে। আমার কথা হল একটা ভুল স্বীকৃতি নিয়ে অনেক রিসোর্স খরচ করে তারপর আবার পরিবর্তন করে সঠিক স্বীকৃতি কেন নেব, একবারে কেন নিতে পারব না। এটারও একটা পলিটিক্স আছে। কারণ বাংলাদেশে বিকল্পধারার যৌনতা বা এমন বিষয় নিয়ে যেসব সংস্থা কাজ করে তারা এগুলো নিয়ে এত সোচ্চারভাবে কথা বলতে পারে না। হিজড়াদের যে একটা সাংস্কৃতিক ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা আছে, এটা তো একটা পাবলিক কালচারের অংশ, অবশ্যই এর গ্রহণযোগ্যতা আছে। এদের রিকগনিশন দেওয়া সমাজের জন্য অনেক ইজি। এরা তো সমাজের অংশ। কিন্তু রিকগনিজেশনে অফিশিয়াল ডেফিনেশনে এদেরকে ডিজেবল হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই ডিজ্যাবিলিটির ফ্রেমওয়ার্কের একটা ক্ষতিকর দিক আছে। আগে যেটা ছিল ডিসফিগারমেন্টের একটা ফ্রেমওয়ার্ক, এখন সেটাকে ডিজ্যাবিলিটির ফ্রেমওয়ার্কে নিয়ে আসা হচ্ছে। এটা কতটা ফলপ্রসূ হবে ইভেনচুয়ালি এই গ্রুপের জন্য় তা নিয়ে আমার সংশয় আছে। আমি হাইলি রেকমেন্ড করবো আমার প্য়ারাডক্স অব রিকগনিশন লেখটা পড়তে। সেখানে বিষয়গুলো আমি বিস্তারিত লিখেছি।

নাসরিন: আমার কাছে খুব মজার লেগেছে আপনার কাউন্টার কালচারাল ফর্মেশনের আইডিয়াটা। পাল্টা সাংস্কৃতিক নির্মাণ। এভাবে হিজড়াদের নিয়ে আমি কখনো ভাবিনি।

আদনান: কাউন্টার কালচার ফর্মেশন এবং একই সাথে এক ধরণের ফর্ম অফ রেজিস্টেন্স বটে। যদিও এই ভাবনারও একটা সমস্যা আছে। আমি এটাকে পুরোপুরি রেজিস্টেন্স হিসেবে দেখতে চাইনা। এটা স্কলারদের এজেন্ডা, আমরা সবকিছুকে রেজিস্টেন্স হিসেবে দেখতে চাচ্ছি। এটা ওয়েস্টার্ন কুইয়ার থিওরির লিগেসি। অনেক ক্ষেত্রে ও শুধু হিজড়া হতে চায়, ও ইন্টারেস্টেড না আপনার হেটারোনরম্যাটিভিটি, জেন্ডার নরম্যাটিভিকে চ্যালেঞ্জ করতে। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ ভাবে আই জাস্ট ওয়ান্ট টু বি মি। কিন্তু এগুলোর একটা অপরিকল্পিত আউটকাম হচ্ছে আপনার আমার ফিক্সড ইমোশনে একটা চপেটাঘাত পড়ছে। কিন্তু এইরকম ভাবে দেখানো যে, হিজড়া হচ্ছে একটা জেন্ডার যোদ্ধা, এটা ভুল। এটাকে বলে পলিটিকাল ইনটেনশনালিটি। আমাদের রিসার্চের ক্ষেত্রে একটা বড় সমস্যা হল যখন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী নিয়ে আমরা গবেষণা করতে যাই আমরা মনে করি যে এটা একটা রেজিস্টেন্স; রেজিটেন্সও হয়তো আছে কিন্তু সেটা কি ফর্মে সেটা বুঝতে হবে আমাদের। আর গণহারে হিজড়ারা সব রেজিস্টেন্স করছে – এই এ্য়াপ্রোচকে আমি সন্দেহের চোখে দেখি।   

নাসরিন: কিন্তু তাদের অস্তিত্বটা তো জেন্ডার সেক্সুয়ালিটি নরমালসিকে আনসেটলড করছে। না?   

আদনান: হ্য়াঁ এবং ক্লাস। ক্লাসকে বাদ দেয়া যাবেনা এখানে। জেন্ডার, সেক্সুয়ালিটি, ক্লাস এবং কিনশিপ, এগুলো অনেক কিছু আছে। কিনশিপ, ক্লাস এগুলো খুবই কানেক্টেড। ক্লাস ইজ সো সেন্ট্রাল হিজড়া সাবজেক্ট পজিশন সোশ্যাল প্রোডাকশনে। এরা যদি ওয়ার্কিং ক্লাস না হত তাহলে হিজড়া ক্যারেক্টারটাই অন্যরকম হত। হিজড়া একেবারেই একটা ওয়ার্কিং ক্লাস সাবকালচার। এট লিস্ট বাংলাদেশে তো আমি ইমপেরিকালি আমি কনটেস্ট করে বলব। আমি যেহেতু ইন্ডিয়া বা পাকিস্তানে ফার্স্ট হ্যান্ড রিসার্চ করি নাই কিন্তু ওদের সম্পর্কে লেখার সাথে আমি ফ্যামিলিয়ার সেটা থেকে যদি আমি ইনফার করি তাহলে মোটাদাগে আমি অবশ্যই বলতে পারি ওটাও হাইলি ক্লাস স্পেসিফিক ওদের কনটেক্সটে। আর বাংলাদেশের কনটেক্সটে তো একেবারেই ক্লাস স্পেসিফিক। অর্থ্যাৎ আপনি শুধুমাত্র নিম্নবিত্ত হলেই হিজড়া হবেন, মধ্যবিত্ত হলে তো হিজড়া হবেনই না। এটা একটা অন্য় প্রশ্ন, মধ্যবিত্ত হলে তাহলে কি হয়। তারা অন্য কিছু হতে পারে, তারা গে হতে পারে, বা অন্য দেশে গিয়ে থাকতে পারে, তাদের জন্য় কোন স্পেস নাই। এইটাও একটা প্রবলেম। মিডল ক্লাসের জন্য আরো সমস্যা কারণ রেস্পেক্টিবিলিটির জন্য তারা এটা নিয়ে কথা বলতে পারে না। আমাদের দেশে আমার যেটা খুব খারাপ লাগে সেটা হল  ভাবনাগুলো খুব ভুলে ভরা, যারা গবেষণা করে, কাজ করে তারা ভুলভাল কথা বলে দেখি টেলিভিশনে, ভুলভাবে উপস্থাপন করে।  তাদের সংবেদনশীলতাটা জরুরি। হিজড়াদেরকে নিয়ে আমাদের দেশে ফিল্ম যেগুলো বানানো হচ্ছে সেগুলো হচ্ছে এক্সাম্পল অফ হাউ নট টু মেক এ ফিল্ম। এভাবে তো আপনি দেখাতে পারেন না। রিসার্চ এত কম করে কিভাবে একটা জনগোষ্ঠী নিয়ে কাজ করেন। আমি মনে করি হিজড়াদের কাউন্টার কালচারটা হল অলটারনেটিভ স্পেস অফ এক্সপ্লোরিং ভ্যারিড ফর্মস অফ সেক্সুয়ালিটিজ। যেটা আদারওয়াইজ আনএ্য়াভেইলেবল টু মেইনস্ট্রিম।

নাসরিন: এটার জন্য়ই কি এতো ভয় পায়? এই জন্যই কি এতো অপ্রেশন?

আদনান: যেমন ধরেন এটা একটা এনাল স্পেস ভার্সাস একটা পিনাল স্পেস। ওরা যে প্লেজারকে দেখে সেটা দেখে একটা এনাস এর পয়েন্ট অব ভিউ থেকে। একটা পিনাল ফ্রেমওয়ার্ক থেকে না। আমার বইয়ের মূল বক্তব্য হল আমরা কিভাবে লিঙ্গের হেজিমনিকে চ্যালেঞ্জ করতে পারি। হিজড়ারা আমাদেরকে একটা বর্ডার করে দিয়েছে, ইট এলাউজ আস  টু চ্যালেঞ্জ দ্য হেজিমনি অফ পিনাস। এ্য়ান্ড হাউ উই থিংক এবাউট জেন্ডার এ্য়ান্ড সেক্সুয়ালিটি। এর মধ্যে একটা এক ধরণের সেক্সিজম আছে। সেক্সিজমটা এইরকম বলতে পারি আমি, এটা জেন্ডার রিলেশনের একটা স্ট্রাকচারাল ইনিকুয়ালিটি। এখানে কিন্তু মেয়েরা বাদ পড়ে যাচ্ছে। হিজড়া সেক্সুয়াল ইকোনমির ফ্রেমওয়ার্কে মেয়েরা রিডানডেন্ট। হিজড়ারা এসার্ট করছে যে ওরা মেয়েদের থেকে বেশি সুখ দিতে পারে, কারণ এনাস ইজ টাইটার দ্য়ান দি ভ্য়াজাইনা। এটা ওরা এসার্ট করছে। এটা অল্টারনেটিভ একটা ফ্রেমওয়ার্ক। আপনি বলতে পারেন এখানে সেক্সিজম আছে; হা আছে, দ্যাট ইজ দেয়ার।

এখানে পুরুষ পুরুষের মধ্যে থেকে সুখ দিচ্ছে, নিচ্ছে। অল্টারনেটিভ ফ্রেমওয়ার্কটা হল ওরা একটা এনাস দিয়ে দেখছে। যৌনসুখের জন্য আপনার একটা পেনিসের প্রয়োজন নাই। অর্থ্যাৎ আমরা যখন সাধারণভাবে যৌনসুখটাকে ভাবি তখন একটা ইজাকুলেটরি ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যেই ভাবি। যদি পর্ণ দেখেন, যখনই বীর্য স্খলন হয় তখনই পর্ণটা শেষ। আমাদের যৌনতার ভাবনার, শুধু বাংলাদেশ না গ্লোবালি, ফ্রেমওয়ার্কটাই পুরুষের ইজাকুলেশন সেন্ট্রিক। যেই মোমেন্টে একজন ইজাকুলেট করছে, এন্ড অফ দ্য গেইম। হিজড়াদের ফ্রেমওয়ার্কে কিন্তু এটা না। ওর সুখ পাওয়ার জন্য ওর দরকার হচ্ছে এনাস। এনাল প্লেজারটা হচ্ছে সুপিরিয়র। পিনাসের দরকার আছে, ব্যবহার আছে। একটা এ্য়াকটিভ শরীরে একটা পিনাস আছে, একটা এনাস আছে। এই জন্য ওরা পিনাস ফেলে দিচ্ছে, কোন দরকার নাই তো। আমাদের দেশে মনে করা হয় এরা এসেক্সুয়াল, এদের মধ্যে কোন যৌনতা নাই। কারণ লস অব পিনাসকে আমরা মনে করি লস অব প্লেজার। একজনের পুরুষাঙ্গ ছাড়াও এনাল ট্র্য়াক্ট-এ যদি আপনি ম্যাসাজ করেন তাহলে সে ইজাকুলেট করতে পারবে। আপনার পিনাসের দরকারই নাই। এটা বায়োলজিক্যালি একটা লোককে ধরে দেখাতে পারব। আমার একটা বন্ধু এটা এক্সপেরিমেন্ট করেছে, সে একজন বিজ্ঞানী। এর সাথে সমকামীতার সম্পর্ক নাই।

লিঙ্গ না থাকার কিন্তু অনেক মিনিং আছে। কিন্তু আমি আমার বইয়ে দেখিয়েছি যে এটা কিভাবে হাইপার মাসুকিলিনিটির উল্টা। এটার একটা রিচুয়াল কনটেক্সট আছে। মিথ আছে, গল্প আছে, কেন এটা হয়েছে, পুজা-পাট, ভেরি ফ্যাসিনেটিং। আমার যে লেখাটা, একাডেমিক লেখা তো মানুষ পড়ে না, কিন্তু আমি অবাক এবং খুশি যে এই লেখাটা এগারো হাজার মানুষ পড়েছে। জার্নালের এডিটর আমাকে লিখেছে, তাই আমি জানতে পেরেছি যে ঐ জার্নালের ইতিহাসে হায়েস্ট ভিউড আর্টিকেল এটা। এটাকে আমি গর্ব হিসেবে দেখছিনা। আর্টিকেলটা লিখেছি একটা ইন্টারভেনশন হিসেবে। এই ইনিকুয়ালিটি ও অবিচারকে এড্রেস করতে হবে। আমি যা যা এ নিয়ে ভাবছি এই স্পেসের মধ্যে সবগুলো কথা আমি লিখতে পেরেছি। এই কারণে লেখাটার কথা আমি বারবার বলছি। এটাকে আপনি একাডেমিক কনট্রিবিউশন হিসেবেও আপনি দেখতে পারেন, তার থেকেও দেখতে হবে অবিচারের বিরুদ্ধে আমার একটা প্রোনাউন্সড পজিশনিং হিসেবে। ঐখানে বিস্তারিত আছে। লেখাটা পড়তে পারেন। যেহেতু আলোচনাটা শুনলেন। রিলেট করতে পারবেন।

নাসরিন: আমার কাছে আপনার ভাবনাটা খুবই ইন্টারেস্টিং লাগছে। আমাদের ভাবনায় পেনিসের রেজিম বা শ্রেষ্ঠত্ব বা প্লেজারকে দেখার ইজাকুলেটিং দৃষ্টিভঙ্গী খুবই ডমিনেটিং।

আদনান: হিজড়াদের অন্যরকম ফ্রেমওয়ার্ক দিচ্ছে, পেনিসের দরকারই নাই।

নাসরিন: ওরা অন্য একটা সম্ভাবনা আমাদের সামনে নিয়ে আসছে।

আদনান: পার্টিকুলারলি পুরুষদের জন্য, পিনাসের দরকারই নাই, পিনাস ছাড়াই একজন পুরুষলোক অর্গাজম এক্সপেরিয়েন্স করতে পারেন এবং সেই সুখটা পিনাল অর্গাজমের থেকে বেশী ইন্টারেসটিং। এখানে মজার ব্যাপার হচ্ছে, ঐটা আপনি এ্য়াক্সেস করতে পারবেন বা ঐটায় আপনি এনটাইটেলড হবেন যখন আপনি নরম্যাটিভ মাসকুলিনিটিকে ফোরগো করবেন। আপনি একই সাথে নরম্যাটিভ হবেন আবার ঐ সুখও পাবেন, দুইটা পাবেন না। এই কারণে হিজড়াদের ফ্রেমওয়ার্কে, ওদেরও কিন্তু যৌনতাকে নিয়ে ষ্ট্র্য়াটিফিকেশন আছে। ওদের মধ্য়ও কিন্তু কোনটা খারাপ সেক্স কোনটা ভাল সেক্স এই নিয়ে ভাবনা আছে। হিজড়ারা কোন পুরুষকে পেনিট্রেট করবে এটা ওরা মানে না। আপনি রিসিভ করবেন কিন্তু পেনিট্রেট করতে পারবেন না। এর কারণটা কি। আপনি সবই করছেন আবার ঐ সুখও নেবেন তা হবে না। তাই ছেড়ে আসতে হবে। ছেড়ে আসলেই তুমি এই সুখটা পাবা, এটা ওদের কনসেপচুয়াল ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যে আছে। একটা চ্যাপ্টারই আছে আমার বইয়ের, এনাল প্লেজার, পাওয়ার এন্ড সেক্স। এই চ্যাপ্টারটা হিজড়া সেক্সুয়ালিটি, কিভাবে আমরা ভাবছি এবং এনাস দিয়ে কিভাবে ভাবতে পারি এটা পুরা এথনোগ্রাফি করে দেওয়া। আমি ডিটেইলে এথনোগ্রাফি করেছি। আমরা তো দেখি শুধু করুনার ফ্রেমওয়ার্কে। বাইরে থেকে দেখা আর ভেতর থেকে দেখার মধ্যে অনেক ডিফরেন্স আছে।

নাসরিন: করুনার ফ্রেমওয়ার্ক কোন ক্ষেত্রেই কাজের না। করুনার বিপদেই তো আমরা আছি। খুবই ইন্টারেস্টিং। আপনার বইটা শেষ করে ফেলা উচিত। আপনার বইয়ের জন্য় শুভ কামনা জানিয়ে আজকে শেষ করছি।

[আদনান হোসেইন একজন বিজ্ঞানী। তাঁর আগ্রহ জেন্ডার, সেক্সুয়াল ডাইভার্সিটি, ট্রান্সজেন্ডার, এথনিক/রেসিয়াল সম্পর্ক নিয়ে। বর্তমানে তিনি আম্সটারডামের ফ্রি ইউনিভার্সিটিতে কর্মরত। খুব শিগ্গিরি হিজড়া বিষয়ে তাঁর একটি বই প্রকাশ হতে যাচ্ছে। তাঁর প্রকাশিত লেখাগুলো পড়তে চাইলে ক্লিক করুন : https://research.vu.nl/en/persons/adnan-hossain ]



Categories: কথোপকথন

2 replies

  1. আদনান হোসেইন আপনার আলোচনাটি পড়ছিলাম। ভালো লাগছিলো, হঠাৎ একটা জায়গায় খুব খটকা লাগলো –
    ” আর বাংলাদেশের কনটেক্সটে তো একেবারেই ক্লাস স্পেসিফিক। অর্থ্যাৎ আপনি শুধুমাত্র নিম্নবিত্ত হলেই হিজড়া হবেন, মধ্যবিত্ত হলে তো হিজড়া হবেনই না। এটা একটা অন্য় প্রশ্ন, মধ্যবিত্ত হলে তাহলে কি হয়। তারা অন্য কিছু হতে পারে, তারা গে হতে পারে, বা অন্য দেশে গিয়ে থাকতে পারে, তাদের জন্য় কোন স্পেস নাই। ”
    আপনার বক্তব্য/ভাবনাটা একটু পরিষ্কার করে ব্যাখ্যা করবেন কি ?

  2. আদনানের সঙ্গে নাসরিনের এই কথোপকথন বোঝাবুঝির অস্পষ্টতা দূর করতে দারুণ পাঠ্য একটা দলিল। আদনানের বইটি কোন ভাষায় রচিত হবে তা কেবল আন্দাজ করি; তবে আশা করি তিনি বাংলায় কিছু একটা হাজির করবেন।

Leave a Reply to Dipa Mahbuba Yasmin Cancel reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: