
সাহারা চৌধুরী রেবিল: গত সপ্তাহে এখানে (শাহবাগে) আজাদী মঞ্চের লোকেরা সমকামী সন্দেহে তাদের উপর আক্রমণ করে। অই সময় আক্রমণের যে মবটা তৈরি হয়েছিলো অই মবটাকে পুলিশ থামানোর চেষ্টা করে নি। অই সময় পুলিশ আসেপাশে ছিলো, কিন্তু মবটাকে থামানোর চেষ্টা করে নাই। আর অভিযোগ ভিক্টিমরা দিতে গেছে, পুলিশ এইটা লিখিতভাবে অভিযোগটাকে রেজিস্ট্রার করে নাই। এখন এক সপ্তাহ পরে আমরা এই জায়গায় এসেছি আমাদের পাবলিক প্লেসে থাকার অধিকারকে বাস্তবায়িত করার জন্য, আমাদের যে অধিকার আছে সেটা তুলে ধরার জন্য, আমরা সবাই এইভাবে আমাদের জায়গাতে অবস্থান করার জন্য। কিন্তু এখানে আমাদের যেসব গণতান্ত্রিক অধিকার না থাকার কারণে আমাদেরকে প্রান্তিকতার দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, এই অধিকারগুলো না থাকার কারণে কিন্তু দায়ী হলো রাষ্ট্র। সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্র যেসব মবগুলো তৈরী হইতেছে, সেইগুলোর জন্য সম্মতি তৈরী করতেছে। তো আমরা সেইটার বিরুদ্ধে দাড়াইতেছি, আমরা আমাদের অধিকার চাইতেছি। যাতে সেসব প্রান্তিকতা থেকে আমরা বের হয়ে আসতে পারি। যাতে প্রান্তিকতা থেকে বের হয়ে এসে আমরা আমাদের অধিকার নিয়ে সাধারণ নাগরিকদের মতো জীবনযাপন করতে পারি।
এখন পুলিশ গত সপ্তাহে যে মব অ্যাটাক দিয়েছিলো, অই সময় মবকে থামানোর চেষ্টা করে নাই, ভিক্টিমদের অভিযোগ লিখিতভাবে রেজিস্টার করে নাই। আর আজকে এসে আমরা যেভাবে অবস্থান কর্মসূচি ধারণ করেছি, তখন পুলিশ এসে আমাদেরকে বলতেছে যে ১৪৪ ধারা নাকি জারি করা হয়েছে কারণ আজাদী মঞ্চ, যেই মঞ্চ গত সপ্তাহে সমকামী সন্দেহে কিছু মানুষকে অ্যাটাক করেছিলো তারা নাকি আবারো আমাদের হুমকি দিচ্ছে, যে আবারো নাকি এখানে হামলা করা হবে। তো আমরা এখানে বলছিলাম যে, হামলা খেতে আমরা রাজি আছি— যে, আজাদী মঞ্চ যদি আবারো সহিংসতার দিকে নিতে চায়, তাহলে সেটা আজদী মঞ্চের সিদ্ধান্ত হবে। কিন্তু পুলিশ সেখানে আজাদী মঞ্চের সহিংসতাকে থামানোর বদলে আমাদেরকে বলছে উঠে যেতে। এখন এই যে এখানে পুলিশের উঠে যাওয়ার কথা, এটাকে পুলিশ নিউট্রাল হিসাবে ফ্রেইম করতেছে, তারা বলতেছে, “আমরা কোনো পক্ষেই নাই, আমরা অমুক পক্ষেও নাই, তমুক পক্ষেও নাই।” অথচ গত সপ্তাহে যখন কিছু মানুষকে, যারা সমকামী নাও হইতে পারেন, যারা হয়তো কেবল চুল ছোট ছিলো কিংবা চুল লম্বা ছিলো— সেই সন্দেহে তাদেরকে ধরে পিটানো হয়েছে, তখন কিন্তু পুলিশ নিশ্চুপ থাকছে, তখন কিন্তু…
সাংবাদিক: মানে সমকামী হইলেও তাতে তাদের কি? মানুষ হিসাবে তও তাদের অধিকার আছে।
সাহারা: এই কারণেই তো আমরা আজকে আমাদের ব্যানারের মধ্যে লিখেছি, “হ আমরা সমকামী, আয় শালা, পারলে মার আমাদেরকে।” আমাদের কথা হলো যে এখানে সন্দেহটা সঠিক কী বেঠিক তাতে কিছু আসে যায় না। আমরা, আমাদের অধিকার আছে নাগরিক হিসাবে রাস্তায় থাকার।
সাংবাদিক: আপনাদের কী, অধিকারগুলো যদি একটু বলেন, আসলে? কী দাবিতে আজকে এইখানে দাড়াইছেন। নাগরিক হিসাবে আপনি গভর্নমেন্টের কাছে কী দাবি করতেছেন?
সাহারা: আমাদের আজকের যে ঘটনাটা ঘটলো, যেখানে পুলিশ আমাদেরকে আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চা করতে দিতেছে না। ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে, তারা আমাদেরকে সরে যেতে বলতেছে, এইটাই আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার লঙ্ঘনের একটা ব্যাপার। ধরেন যদি, বিএনপি এইখানে আজকে একটা কর্মসূচি করতো, তাহলে জামাত এসে যদি বলতো বিএনপির উপর তাদের অ্যাটাক হবে তাহলে কিন্তু পুলিশ এসে বিএনপিকে বলতো না যে, “আপনারা এখান থেকে চলে যান, ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে।” তখন বিএনপি বলতো যে “জামাত এইখানে সন্ত্রাসী কাজ করেছে, জামাতকে গিয়ে আটকে দিন।” কিন্তু আমরা, আমাদেরকে পুলিশ একদিকে বলতেছে এইটা (“হ, আমরা সমকামী, আয় শালা পারলে মার আমাদেরকে”) একটা রাজনৈতিক ব্যানার, রাজনৈতিক ব্যানার যদি দাড় করাতে চান তবে পুলিশের কাছ থেকে অনুমোদন নিতে হবে, আবার অন্যদিকে বলতেছে “বিএনপি একটা রাজনৈতিক দল, আপনারা কোনো রাজনৈতিক দল না।” সুতরাং আমরা একটা Schrodinger’s Political Party-র অবস্থানে আছি। তাদের সুবিধা হইলে আমরা রাজনৈতিক কিছু না, তাদের সুবিধা হইলে আমরা রাজনৈতিক। তো এইরকমের ফাইজলামি কইরা পুলিশ আমাদেরকে আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চা করতে দিতেছে না। গত সপ্তাহে মব যখন তৈরি হইছিলো, তখন মব বলছিলো যে তারা নিজেদের হাতে শাহবাগ থেকে সমকামী দূর করবে। এখন আজকে যেহেতু আমরা সাহস নিয়ে কোনো দ্বিধা ছাড়া আমাদের জায়গাতে দাড়িয়েছি তখন তারা ভীতু কাপুরুষের মতো, paper tigerএর মতো পুলিশের কাছে গিয়ে অভিযোগ করতেছে। পুলিশের কাছে গিয়ে ঠ্যাং ধরতেছে।
সাংবাদিক: আপনাদের দাবিগুলো যদি একটু…
সাহারা: আমাদের দাবিগুলোর মধ্যে একটা হইলো গিয়া সমকামী ও লিঙ্গ বৈচিত্র মানুষদের জন্য বিবাহের অধিকার। কর্মসংস্থান ও বাসস্থানের বৈষম্যবিরোধী সুরক্ষা। আইনী স্বীকৃতি ও সামাজিক নিরাপত্তা এবং শেষ হলো সহিংসতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা। গত সপ্তাহে যে সহিংসতাটা হইলো, কিছু মানুষদেরকে সমকামী ট্যাগ দিয়ে অ্যাটাক করা হইলো, এইটা বিরুদ্ধে রাষ্ট্র কোনো জায়গায় গেছে না। যারা যারা অ্যাটাক করছে তাদের ছবি সব জোগাড় করা হইছে, তাদের নাম জানা আছে, স্যোশাল মিডিয়ায় এইসব ছড়াইছে, রাষ্ট্র এইটার বিরুদ্ধে কিছু করে নাই, পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে কিছু করে নাই। পুলিশ উল্টা আজকে আইসা আমাদেরকে তাদের কথা শুনাইতেছে, যে তারা আমাদের উপর অ্যাটাক করবে, সেই কারণে আমাদেরকে চলে যাইতে বলে। তো এইখানে আমরা দেখতে পারতেছি, পুলিশ যতোই নিজেকে নিরপেক্ষ দাবি করুক না কেনো সত্যি পক্ষে পুলিশ অদের সাথেই দাড়াইয়া আছে, অদের পক্ষই নিতেছে।
সাংবাদিক: তাদের উদ্দেশ্যটা কী? তারা কী বলে? আপনারা এইখানে থাকলে তাদের সমস্যাটা কী?
সাহারা: তারা বলতেছে যে আমরা সন্ত্রাসী, আমরা সমকামী হওয়ায় সামাজিক মূল্যবোধ ধ্বংস করতেছি। এইটা হলো তাদের দাবি। এখন এই দাবি নিয়ে তারা বলতেছে আমাদের উপর অ্যাটাক করা হবে।
সাংবাদিক: তাদের দাবি কী এটা সত্য, না, আপনি কী বলেন?
সাহারা: না অনেক সায়েন্টিফিক প্যাপার আছে, যে সমকামী মানুষরা অপ্রাকৃতিক কিছু না। যদি আমাদেরকে বলা হয় যে আমাদের সম্পর্কের প্রজনন-ক্ষমতা নাই সুতরাং আমাদের সম্পর্ক অবৈধ, তাহলে বন্ধ্যা নারী যারা আছে, তাদের সম্পর্কও অবৈধ হয়ে যাবে। বন্ধ্যা পুরুষ যারা আছে তাদের সম্পর্কও অবৈধ হয়ে যাবে। তো যান! বন্ধ্যা নারী ও পুরুষদের খুঁজে বাইর কইরা অ্যাটাক করেন! দেখা যাক কতদূর তা আপনাদের ক্ষমতা আছে! তো এখন যদি প্রজননের উপর ভিত্তি কইরা আমাদেরকে অপ্রাকৃতিক ট্যাগ দেওয়া হয়, যদিও প্রকৃতিতে লক্ষ লক্ষ প্রাণীদের মধ্যে সমকামীতা দেখা গেছে, তাহলে তো এটা বন্ধ্যা নারী ও বন্ধ্যা পুরুষদের উপরও তারা ছড়াবে। তাহলে এইখানেই এইটা প্রমাণিত হয় যে, সমকামী মানুষদের অধিকার দেওয়া না হইলে, কোনো না কোনো এক সময়ে, ফ্যাসীবাদ যখন বাড়তেই থাকবে, তখন কোনো না কোনো এক সময়ে যারা বাচ্চা নিতে সক্ষম না, তাদের উপরেও অ্যাটাকটা আসবে। মনে করেন যে, এখনই যে “শাহবাগ থেকে সমকামী হটাও” কথাটা বলতেছে এরা, এখানেও তো তারা সাধারণ মানুষকেও অ্যাটাক করবে।
সাংবাদিক: তো তারা কোথায় যাবে? মানে তারা কোথায় থাকবে? মানে এখান থেকে যাওয়া মানে তো কোথাও যাওয়ার কথা বলে, তো তারা কোথায় যাবে সেটা বলে না?
সাহারা: এইটা এরা বলতেছে যে, এইটা হইলো এদের একটা scare tactic. এইটা এরা খুব ভালো ভাবেই জানে যে আমরা বাংলাদেশের নাগরিক, আমরা বাংলাদেশ থেকে যাবো না। অরা যা চাইতেছে তা হলো, আমাদেরকে পাবলিক পরিসর থেকে জোর করে বের করে দিয়ে প্রাইভেট পরিসরে রাখা। আমাদের অনেকগুলা রিসার্চ প্যাপার আছে, স্ট্যাটেসটিকস আছে। সমকামী মানুষজন, ট্রান্সজেন্ডার মানুষজন— তাদের বিবাহের অধিকার, শিক্ষার অধিকার, কর্মক্ষেত্রের অধিকার, anti-discrimination law, এইসব না থাকার কারণে তারা অনেক সময় পরিবারের কাছে বৈষম্যের স্বীকার হইতেছে। কারণ পরিবার দেখতেছে যে তাদের ভবিষ্যতের কোনো সুরক্ষা নাই। ভবিষ্যতের সুরক্ষা বলতে, আপনি আপনার সন্তান সে কোনদিকে যাবে সেইটার একটা রূপরেখা আপনার কাছে আছে, আপনি জানেন যে আপনার সন্তান বিবাহ করতে পারে, আপনার সন্তান চাকরি পেতে পারে, আপনার সন্তান শিক্ষা নিতে পারে, ভবিষ্যতে আপনাএ ক্যায়ার করতে পারবে। তো সমকামী মানুষজন, ট্রান্সজেন্ডার মানুষজনের পিতামাতারা যখন দেখতেছে যে তাদের এই সুযোগটা নাই — তখন তারা কী করতেছে? তারা তাদের সন্তানদের ঘর থেকে বের করে দিতেছে। তখন তাদের সন্তানরা যাইতেছে ব্যাশ্যাপল্লিতে, হিজরাপল্লীতে, যেখানে তারা coerced হইতেছে পতিতাবৃত্তিতে। [1] এইটাই হইলো গিয়া শাসক শ্রেনীর মূল উদ্দেশ্য। আজাদী মঞ্চই হোক বা নানাবিধ যেসব সমকামী বিরোধী দলগুলাই হোক, তাদের মূল উদ্দেশ্যই হলো পাবলিক পরিসর থেকে সমকামী, ট্রান্সজেন্ডার, লিঙ্গবৈচিত্র মানুষদেরকে বের করে দিয়ে আমাদেরকে একটা প্রাইভেট পরিসরে রাখা, যেখানে আমাদেরকে আর্থিকভাবে যৌনভাবে শোষণ করা তাদের জন্য আরো সহজ হয়। এইটাই হলো তাদের আসল লক্ষ্য। এখন এইসব কথা আনলে তারা বলবে যে, এটা তাদের একটা প্রচলিত কৌশল, তারা বলে যে “আমরা ইন্টারসেক্স মানুষদের সমর্থন করি, কিন্তু আমরা সমকামী ও ট্রান্সজেন্ডার মানুষদের সমর্থন করি না। এইটা একটা ফালতু কথা। এইটা কোনো প্রকৃত সমর্থন না, তাদের উদ্দেশ্য হলো বিভেদ-বিভাজন তৈরি করে আমাদের কমিউনিটিকে দূর্বল করে একটা divide এবং conquer নীতি জারি রাখা। ব্রিটিশরা যেরকম এই মহাদেশে হিন্দু আর মুসলিমদের মাঝে বিভেদ তৈরী করেছিলো, তাদের উদ্দেশ্য হলো, “কমিউনিটির নির্দিষ্ট আইডেন্টিটির অমুককে সমর্থন করি, তমুককে সমর্থন করি না” এইসব বলে একটা বিভেদ তৈরী করা যাতে তারা নিজেদেরকে আরও নিয়ন্ত্রণমূলক একটি যায়গায় রাখতে পারে। তারা চায় যে ডানপন্থীরা নিজেরা নিজেদেরকে নির্ধারক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবে কে ইন্টারসেক্স, কে আন্তলিঙ্গ, আর কে ট্রান্সজেন্ডার কে সমকামী সেটা নিয়ে ঢং করা। তো, এখন যদি একটা ট্রান্সজেন্ডার মানুষ গিয়া বলে যে, “আমি জামাত, আমি ইসলামিস্ট পার্টিগুলারে সাপোর্ট করি”, তখন তারা বলবে যে, “ঠিক আছে, অমুক মানুষ আন্তলিঙ্গ”। সমকামী মানুষ যদি বলে যে “আমি শিবির, ইসলামিস্টদেরকে সাপোর্ট করি”, তাহলে তারা বলবে, “ঠিকা আছে, ঐ মানুষটা আন্তলিঙ্গ”। কিন্তু একজন আন্তলিঙ্গ মানুষ যদি বলে যে, “আমি এইসবের সাথে নাই”, তাহলে ট্যাগ দিয়ে দিবে যে, “সে সমকামী-ট্রান্সজেন্ডার”, এইটা পুরোটাই তারা তাদের হাতে নিয়ন্ত্রণ করবে। অবশ্যই আমার মতে সমকামী ও ট্রান্সজেন্ডার মানুষ আন্তলিঙ্গ মানুষদের মতো অধিকার পাবে, কিন্তু আমি তাদের উদ্দেশ্যের কথা বলতেসি, তাদের উদ্দেশ্যই হলো এরকম বিভেদ সৃষ্টি করে নিজেদেরকে নির্ধারক তৈরি করা, কে ট্রান্সজেন্ডার ট্যাগ পাবে, কে ইন্টারসেক্স ট্যাগ পাবে, আর কে সমকামী ট্যাগ পাবে। বাস্তবে এইটা visibly queer মানুষ , দৃশ্যমান queer মানুষ, দৃশ্যমান লিঙ্গবৈচিত্রের মানুষ, দৃশ্যমান সমকামী-ট্রান্সজেন্ডার মানুষ, তাদেরকে বাধ্য করে রাষ্ট্রকাঠামো, পূঁজি ও ডানপন্থীদের প্রতি, ধর্মতান্ত্রিক দের প্রতি একটা আনুগত্য প্রমাণ করতে ও সেই আনুগত্য বজায় রাখতে। যাতে তাদের উপর ডানপন্থীরা ইচ্ছেমতো লেবেল দিয়ে শাস্তি দিতে পারে অথবা তাদেরকে আধা টাইপের স্বীকৃতি দিতে পারে। তো এইযে এরা বলে যে, “আন্তলিঙ্গ মানুষদের সাপোর্ট করি”, হয়তো এরা কয়েকজন মিইলা কয়েকটা টাকা দিয়া একটা আন্তলিঙ্গ মানুষকে একটা বিজনেস স্টল করে দিবে, হয়তো একটা হিজরা মানুষকে একটা বিজনেস স্টল করে দিবে, সেইটার ছবি তুলে তারা দেখাইয়া বলবে যে “দেখেন, আমরা কতো সাপোর্টিভ, আমরা কতো woke, আমরা কতটা টলারেন্ট, আমরা কতটা সহনশীল”, কিন্তু ওই মানুষটা যদি তাদের পলিটিক্যাল পার্টির বিরুদ্ধে কথা বলে তখন সাথে সাথে সমকামী ট্যাগ খাইয়া মাইর খাইবে।
সাংবাদিক: এতোদিন তো এটা ছিল না। এটা কোন সমস্যা ছিল না। ইদানীং আমরা এটা দেখতে পাচ্ছি যে এই সমস্যাগুলো, “মব”, তৈরি হচ্ছে। এটা কেন হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে?
সাহারা: ইদানীং এর সমস্যাগুলো যদি ধরেন…
সাংবাদিক: অনেকদিন যাবত আমরাও দেখি যে এখানে আপনারা আসেন, থাকেন, দেখছি আমি বিভিন্ন ধরনের মানুষ মানুষ আসে, যায়। তো এটা তো কোন সমস্যা ছিল না।
সাহারা: এইটা, সমস্যা এখনো কারো হয়নি। সমস্যা এখন যেটা হইসেতে এইটা হইলো গিয়া বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক দলগুলা নিজেদেরকে সাধারণ জনতা হিসেবে ফ্রেইম করতেসে। এরা সাধারণ জনতা না। সাধারণ জনতারা এখানে সারাদিন ছিলাম, তারা কিছু করে নাই, তারা আমাদের বিরুদ্ধে না। তারা যদি আমাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কোন স্টেটমেন্টও দেন সেটা হবে ওই পলিটিক্যাল পার্টির চাপে পইড়া। কারণ এখানে তো তাদের থাকতে হবে। তারা যদি পলিটিকাল পার্টির বিরুদ্ধে যায়, পলিটিক্যাল পার্টির কাছে তো রাষ্ট্রের আনুগত্য আসে, এই পলিটিক্যাল পার্টি আইসা তাদের স্টল উড়ায় দিবে। তো এখন কথা হইলো গিয়া আমাদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ নাই। সাধারণ মানুষদেরকে আমি আজকে সারাদিন লিফলেট প্রদান করছি। সাধারণ মানুষরা কিছু কয়নাই। আমাদের বিরুদ্ধে যারা আছে তারা হইলো কতোগুলা লাইফলেস, সাব-হিউম্যান মানুষ, জন্তুর মতো মানুষ, এদের কাজ হইল গিয়া ফ্যাসিবাদের প্রতিষ্ঠা করা। এরা ফ্যাসিবাদের দোসর হইয়া সবার বিরুদ্ধে গুতা দেয়ার তালে আসে। এখন এইটা তারা যে ইদানীং শুরু করসে, এইটাও তারা কিন্তু পশ্চিমাদের কাছ থাইকা পাইসে, পশ্চিমাদের ঐখানেও ট্রান্সজেন্ডারদের বিরুদ্ধে এতদিন বড় কিছু ছিলো না। ২০১৬ সালের পর থেকে বেন শাপিরো, ম্যাট ওয়ালশ, এরকম জায়নিস্ট ইসরায়েল সাপর্টিভ মানুষরা এসে ট্রান্সজেন্ডার মানুষদের বিরুদ্ধে কথা বলা শুরু করছে। যেখানে আমরা দেখে পারতেছি যে, ট্রান্সজেন্ডার মানুষরা, সমকামী মানুষরা, ঐক্যবদ্ধভাবে তাদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দারাইছে, তাদের সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কথা বলতেছে। ইসরায়েল যে গণহত্যা চালাইতেছে ফিলিস্তিনের মানুষদের উপরে সেইসবের বিরুদ্ধে তারা কাজ করতেসে, Queers for Palestine গ্রুপ আসে, এইধরনের অনেক গ্রুপ আসে, এইসব জিনিসগুলা পশ্চিমা এলজিবিটি মানুষরা করতেসে। তাদের সাম্রাজ্যবিরোধী কাজ তারা চালাইতাছে। কিন্তু আবার এইদিকে, বাংলাদেশে, ডানপন্থীরা, সরোয়ার হোসেনের মতো মানুষরা — ট্রাম্প যখন ট্রান্সজেন্ডারদের বিরুদ্ধে কথা বলে, ম্যাট ওয়ালশ যখন ট্রান্সজেন্ডারদের বিরুদ্ধে কথা বলে, তাদের চার্লি কার্কের মতো মানুষরা যখন ট্রান্সজেন্ডারদের বিরুদ্ধে কথা বলে— তখন তারা দেখে না যে অই একই মানুষরা ইসরায়েলের পক্ষে সাফাই গায়, এই একই মানুষরা ফিলিস্তিনে গণহত্যা চালায়, ইরানে গণহত চালায়। তখন তারা অইসব গণহত্যাকারী সাম্রাজ্যবাদীদের পক্ষ নিয়ে বলে যে, “না, ট্রান্সজেন্ডার-বিরোধী কথা যেহেতু বলছে, সেহেতু তারা ভালো।” এইরকমভাবেই বাংলাদেশের ডানপন্থীরা ট্রান্সজেন্ডার মানুষদের বিরুদ্ধে গেছে, কারণ তারা পশ্চিমাদের কাছে থেকে শিক্ষা নিছে। তারা সমকামীদের বিরুদ্ধে গেছে, কারণ তারা পশ্চিমাদের কাছ থেকে শিক্ষা নিছে।
সাংবাদিক: আপনাদের দাবিগুলা একটু ছোট করে—
সাহারা: আমাদের দাবিগুলা হলো, সাধারণ অন্যান্য মানুষদের কাছে, cishet মানুষদের কাছে যেইসব অধিকারগুলা আছে, আমাদেরও সেইসব অধিকার চাই। আমাদের বিবাহের অধিকার চাই। চাই আমাদেরকে চাকরী থেকে শুধুমাত্র সমকামী হওয়ার জন্য বের করে দেওয়া হবে না। কিছুদিন আগে, বুয়েট না কুয়েটের ক্যাম্পাস থেকে দশজনের মতো শিক্ষার্থীদের বের করে দেওয়া হয়েছিলো সমকামী আখ্যা দিয়ে, এইসব যাতে বন্ধ হয়৷ যাতে মানুষের যৌন পরিচয় বা লিঙ্গ পরিচয়ের মাধ্যমে তাদেরকে শিক্ষা ক্ষেত্র থেকে বার করা না যায়, চাকরী ক্ষেত্র থেকে বার করা না যায়। তাদেরকে পাবলিক প্লেসে বা পাবলিক পরিসরে যাতে থাকতে দেওয়া হয়। সেটা যাতে রাষ্ট্র দ্বারা নিশ্চিত করা হয়। সেটা যদি রাষ্ট্র নিশ্চিত না করে, তাহলে অন্যান্য ঐতিহাসিক সংগ্রাম যেভাবে গেছে, যেভাবেও নিপীড়িত মানুষরা জোরপূর্বক তাদের অধিকার ছিনাই নিছে, কৃষ্ণাঙ্গ মানুষরা যেরকম দাসত্বের বন্ধন থেকে জোরপূর্বক তাদের অধিকার ছিনাইয়া আনছে— নারীরা, সাফ্রেজেটরা যেরকম জোরপূর্বক তাদের ভোটাধিকার পাইছে, সেরকম আমরা জোরপূর্বকই আমাদের অধিকার ছিনাইয়া আনতে বাধ্য হবো৷ যদি আমাদেরকে বিবাহের অধিকার, চাকরিক্ষেত্রে বৈষম্যবিরোধী অধিকার, শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্যবিরোধী অধিকার না দেওয়া হয়।
সাংবাদিক: ধন্যবাদ। আপনার নামটা?
সাহারা: সাহারা চৌধুরী রেবিল।
সাংবাদিক: এখানে আপনার দাবি ব্যানারে আছে “প্রাপ্তবয়স্ক সমকামী মানুষদের বিবাহের অধিকার দিতে হবে।” আমার প্রশ্ন হলো সমকামী বা আপনারা যারা আছেন তারা বিবাহের মাধ্যমে সুস্থ জীবনযাপন করতে পারবেন কিনা?
সাহারা: অকে, প্রথমত আমরা দেখেছি পৃথিবীর অনেকগুলা দেশেই সমকামী বিবাহের অধিকার আছে, সেখানে অনেক সমকামী মানুষই খুব সুখেই জীবনযাপন করতেছে। এইখানে আমাদের অধিকার না থাকার কারণে যেভাবে প্রান্তিকতার দিকে ঠেলে দেওয়া হইতেছে আমাদেরকে, শাসক শ্রেনীর উদ্দেশ্যই হলো সমকামী মানুষদেরকে, ট্রান্সজেন্ডার মানুষদেরকে, আন্তলিঙ্গ মানুষদেরকে পতিতাবৃত্তিতে আবদ্ধ রাখা। আমাদের বিবাহের বৈধতা স্বীকার না করে আমাদেরকে অইধরণের শোষণমূলক নিপীড়নমূলক সম্পর্কে আবদ্ধ রাখাই হলো তাদের মূল লক্ষ্য। কারণ তাদের মূল লক্ষ্য হলো যেসব সম্পর্ক প্রজনন তৈরী করে না, সেইসব সম্পর্ককে বৈধতা না দেওয়া। যাতে প্রাইভেট প্রপার্টি, ব্যাক্তিগত সম্পত্তির যে উত্তরাধিকারপূর্বক বন্টনটা হয় সেইসব রীতিনীতি যেগুলা পুঁজিবাদের মূলে আছে সেইসবগুলো যাতে তারা টিকায়া রাখতে পারে। যাতে তারা জনসংখ্যা বৃদ্ধির মাধ্যমে শ্রমীক শ্রেণির জনসংখ্যা সর্বোচ্চ উর্ধ্বে থাক, তখন তারা শ্রমিক শ্রেণীকে কম মজুরি দিতে পারে। কারণ শ্রমিক শ্রেণী যদি বিপুল পরিমাণে দেশে বেকারত্বে থাকে, তাহলে মানুষরা ধর্মঘট করলে— মনে করেন পপুলেশনের একটা অংশ ধর্মঘট করলো, তখন পপুলেশনের আরেকটা অংশ গিয়া ধর্মঘট ভেঙে দিতে পারে। কারণ যারা বেকারত্বে ভোগতেছে, তারা ধর্মঘট উপেক্ষা করে কম মজুরিতেই সেই সেক্টরে যোগ দিবে। তো এভাবেই পুঁজিবাদীরা ন্যুনতম মজুরীকে একেবারে নিচে রাখে। এইধরণের বিভিন্ন কারণের কারণে, তারা চায় না যে আমরা আমাদের অধিকারগুলা পাই। এখন আপনি জিজ্ঞেস করতেছেন যে এক, আমরা সুখে থাকতে পারবো কিনা। প্রথমত, আমরা প্রকাশ্যেই আছি। আমি আছি এইখানে প্রকাশ্যে, অনেক মানুষ প্রকাশ্যে আছে। ট্রান্সজেন্ডার মানুষরা প্রকাশ্যে থাকা ছাড়া কোনো উপায় নাই। তারা বর্তমানে যে জীবনযাপন করতেছে, আমাদের অধিকার পাইলে তার চাইতে উন্নত জীবনযাপন করতে পারবে। তো সেইটা সুখ হবে নাকি বিসুখী হবে, সেইটা ব্যক্তিগত পর্যায়ে আলাদা আলাদা হবে। কিন্তু আমাদের প্রথম পদক্ষেপ হইলো যেইসব অধিকার না পাওয়ার কারণে আমরা দু:খি হইতেছি সেইসব অধিকারগুলাকে নিশ্চিত করা।




Leave a comment