
একজন বহিরাগত (ঠোঁটকাটার অতিথি ব্লগার)
বাংলাদেশের জনবিতর্ক অনেকটা কোনোমতে দীর্ঘ ম্যারাথন শেষ করে প্রাণপণে হাঁপাতে থাকা এক দৌড়বিদের মতো। এখন কী হবে?
“কোনো মতে টিকে থাকাই পরিবর্তন নয়,” উক্তিটি হানা শামস আহমেদের স্পষ্টভাষী রচনা থেকে নেওয়া, যেখানে তিনি জেনারেল জগলুল আহমেদের সাথে বাংলাদেশের কাঠামোগত সমস্যাগুলো সম্পর্কে এমন ধরণের উদ্বেগ প্রকাশ করেন, যা কেবল একটি মোটামুটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আর ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমেই নিরসন করা সম্ভব নয়।
যারা কেবল ইসলামপন্থী দল ব্যতিত অন্য কোনো কার্যকর বিকল্প না থাকায় বিএনপিকে ভোট দিতে বাধ্য হয়েছিলো, বিএনপির জয় সম্পর্কে তাদের গভীর দোদুল্যমানতাকে ব্যাখ্যা করা বিচক্ষণ বিশ্লেষকদের মধ্যে আহমেদ অন্যতম। এই আশঙ্কাটিও বিদ্যমান যে বিএনপি সত্যি বলতে জয়লাভ করেনি এবং জামাত সত্যি বলতে হারে নি। জামাতের মাঝে এমন এক ধরণের আত্মবিশ্বাস দেখা যাচ্ছে যা একটি তথাকথিত বিধ্বংসী পরাজয়ের পর রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে খুব বিরল।
এই প্রশাসনের কর্মকান্ডে ২০০১-২০০৬ সালের জোট সরকারের উপলক্ষণ দেখা যেতে পারে, হয়তো একটি আরও আরামদায়ক বন্দোবস্ত হিসেবে এটি প্রমাণিত হবে, যতদূর পর্যন্ত শাসনের যেকোনো ব্যর্থতার জন্য প্রতিটি দল একে অন্যকে দোষারোপ করে নিজেদের সমর্থকদের কাছে দায়মুক্ত থাকার সুযোগ পাবে। আমার ধারণা এটি বিএনপির প্রচার-প্রচারণার প্রধান বৈশিষ্ট্য হবে, যখন তারা আওয়ামী লীগের পুরনো চালগুলো ঝালিয়ে নিয়ে তাদের আদর্শহীন ‘জোড়াতালির’ ভোটারগোষ্ঠীকে ধরে রাখার চেষ্টা করবে: “মৌলবাদীদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আমরা ছাড়া তোদের আর কোনো ভরসা নেই।”
প্রভাববলয়গুলোর একটি খসড়া চিত্র ইতোমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মন্ত্রণালয়, সেনানিবাস এবং কূটনৈতিক পাড়াগুলো থাকবে সরকারের কবজায়; যেখানে তারা বাংলাদেশের ‘মধ্যপন্থী মুসলিম পরিচয়’ তুলে ধরে বিদেশী ক্রেতাদেরকে অভিভূত করার চেষ্টা চালাবে। অন্যদিকে, জামাত জাতীয় সংস্কৃতির ওপর নিজেদের প্রভাব বিস্তারে আরও শক্ত হয়ে জেঁকে বসবে এক ক্রমবর্ধিত পুলিশি তল্লাশি আর ব্যারিকেডের বেষ্টনীর বাইরে। মিরপুর ও ধানমন্ডি, এবং সংখ্যালঘুদের বসবাসরত গ্রামীণ এলাকা অথবা পর্যটন কেন্দ্রগুলোর নিকটবর্তী জায়গাগুলো ক্রমবর্ধমানে একেকটি প্রান্তিক সংযোগস্থল হিসেবেই থেকে যাবে, যেখানে সমাজের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বগুলো বারবার বের হয়ে আসবে নারীদের হেনস্তা এবং সাম্প্রদায়িক অনুভূতিতে আঘাতের দাবি সম্পর্কিত সংবাদ-প্রতিবেদনে।
পুরো ব্যাপারটির সবথেকে অদ্ভুত দিকগুলোর মধ্যে এটি একটি। বহু বছর ধরে বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষকরা ‘আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপি-জামায়াত’ দ্বিবিভাজনের ওপর জল ঢেলে আসছিলেন। আমাদেরকে বলা হয়েছিল, হয় এটি শাসকরাষ্ট্রের অপপ্রচার, না হয়, এটি একটি স্থূল আনাড়ি পর্যালোচনা, যেটি সেইসব জটিল সূক্ষ্ম প্রকারভেদসমূহ, যা কেবল যথাযথভাবে দীক্ষিত বিজ্ঞজনদের বোধগম্য, তা অনুধাবন করতে ব্যর্থ ছিল।
অথচ সেই পুরনো বিভাজনটি এক ছমছমে নিখুঁততার সাথে নিজেকে পুনরায় জাহির করেছে। এক আওয়ামী লীগ স্বৈরাচার ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের সময় গণবিক্ষোভের মুখে সেনাবাহিনী দ্বারা ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে, যা বাংলাদেশি জাতিগত পরিচয়ের এক গভীর পুনর্মূল্যায়নকে প্ররোচনা দিয়েছে। ইসলামপন্থী, না হলে, ইসলামীয় উপাদানগুলোর প্রতি এই ঝোঁক যেমন পাকিস্তান, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের দিকে পররাষ্ট্রনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে, তেমনি ভারতের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এক চরম শীতলতা বয়ে এনেছে।
১৯৭৪-এর সাথে এই অস্বস্তিকর মিলগুলো গুলশান-বারিধারা এলাকার বাইরে থাকা অনেক বাংলাদেশি বহু বছর আগেই টের পেয়েছিলেন। ২০১৪ সালের শুরুর দিকেই আমার ঘনিষ্ঠ এক বন্ধু হাসিনা ও তাঁর বাবার শাসনের মধ্যে ব্যক্তিপূজা এবং নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার প্রবণতার তুলনা করেছিলেন। তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী/ অনুমান ছিল শেষটাও একই রকম হবে: “আর তারপর আমাদের ভাগ্যে থাকবে জামায়াত। বিশ্লেষকরা অবশ্য এটি অস্বীকার করবেন, কারণ যে জ্ঞান পঞ্চম শ্রেণি পাস করা যেকোনো সাধারণ গ্রামবাসীর আছে সেই জ্ঞান বেচে মোটা অংকের কনসাল্টিং ফি পকেটে ভরার ব্যাপারটাকে ন্যায্যতা দেওয়া তাঁদের জন্য একটু কষ্টদায়ক।“
কিন্তু নির্বাচনী জোট ঘোষণার কয়েক মাস আগেই আমাকে বলা হয়েছিল যে এনসিপি ‘পুরোটাই জামায়াত’, আর কথাটি কিন্তু সোনারগাঁও হোটেলে বসে নিয়মিত টকশো-সেমিনার করে বেড়ানো তথাকথিত বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে আসে নি।
নির্বাচনী বয়ান সেই পুলিশ আর চোর এবং মুক্তিযোদ্ধা আর রাজাকারের বৃত্তেই ঘুরপাক খেয়েছে, কেবল মেরু উল্টে মূল নাটকের কুশীলবদের জায়গায় এখন কাজ চালাচ্ছে তাদের বদলিরা।
আমি জানি কালের কণ্ঠের কাছে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন দ্বারা উদঘাটিত তথ্যসমূহ কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের পরিবর্তন সম্পর্কিত কেলেঙ্কারি অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সত্যি বলতে এই ঘটনাগুলোতে আমি স্রেফ সস্তা হাস্যকর নাটকীয়তা ছাড়া আর কিছুই খুঁজে পাই না। এগুলো বড়জোর আসল প্রশ্ন থেকে চিত্তবিক্ষেপের উসিলা মাত্র, আর এদের উপযোগিতা আছে কেবল এই প্রশ্নের উত্তরটির আগাম আভাস দেওয়ায়: বিপ্লবটাকে কী শেষমেশ বাঁচানো যাবে?
বিপ্লব বলতে যা বোঝায়, তা এখন পর্যন্ত ঘটেনি—এই বিষয়টি এখন মোটামুটি সবাই মেনে নিয়েছে। কেউ কেউ বলেন বিপ্লবটি হাইজ্যাকড হয়ে গেছে,১ কিন্তু ঠিক কখন এটা ঘটলো আর কারা এর জন্য দায়ী—সেই বিষয়ে আলাদা আলাদা মতামত আছে। এই শূন্যতা আজ বাংলাদেশের অগণিত মানুষের প্রতিদিনের জীবনধারার বাস্তবতায় ধরা পড়ছে।
বিপ্লব এবং জাতীয় সংহতি মূলত সমঝোতা আর পুনর্মিলনের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)-এর মতো সংস্থাগুলো বেশ কিছুকাল ধরে এই কথা বলে আসলেও, ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইআইএলডি) এবং ‘বাংলাদেশ ২.০ ইনিশিয়েটিভ’-এর একটি গবেষণা দলই সবচেয়ে জোরালোভাবে ভুক্তভোগীদের সঠিক বিচার পাওয়ার পথে ‘রাজনৈতিক সমঝোতা ও পক্ষপাতদুষ্ট বিচার’-এর ঝুঁকিগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। বড় বিপদটা এখানেই যে, বিচারহীনতার চেয়ে পক্ষপাতদুষ্ট বিচারটাকেই অনেকে খুশি মনে গ্রহণ করে নিবেন।
কিছু বাংলাদেশি আবার বিচারের জন্য এতটাই মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন যে, গত ডিসেম্বরে তারা নিজেদের দেশের সাংবাদিকদেরই খুন করে ফেলার চেষ্টা করেন; যখন তারা শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র প্রথম আলো এবং দ্য ডেইলি স্টার-এর কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করেন। ‘দ্য আপরাইজিংস ইন বাংলাদেশ উইল নট বি স্টপড’ শিরোনামের এক নিবন্ধে সাজাদ হামিদ এবং রেহান কাইয়ুম মীর ‘জ্যাকোবিন’ পত্রিকার পাঠকদের সেই সম্ভাব্য মানবঘাতিদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশের আহ্বান জানান। তাদের যুক্তি ছিল, ওই হামলাকারীদের কাছে এই পত্রিকাগুলো হলো “প্রচলিত শাসনব্যবস্থার স্বার্থরক্ষাকারী সুশীল মুখোশ”।
এটি বর্তমান উভয় সংকটের এক যথাযথ চিত্র। আমরা এখন জানি যে, এই হামলাগুলো ছিল উস্কানিদাতাদের দ্বারা পরিকল্পিত, যারা সাংবাদিকদের ‘ভারত-পন্থী’ বা ভারত সরকারের স্বেচ্ছাসেবী দালাল হিসেবে চিত্রিত করেছিল। তারা বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থা, যা দীর্ঘ জুলাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অপরিবর্তিত রেখেছে, তার বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে তাদের ধান্দা মোতাবেক এক বলির পাঁঠার দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে।
এই হলো ভারত, সান্ত্বনা পুরস্কার হিসেবে। এই ভারতই এখন বাংলাদেশিদের শেষ সম্বল, কারণ ন্যায়বিচার নেই তাদের ভাগ্যে।
এখানে ভারতের প্রতি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কোনো হুমকি রাখে কিনা সেই বিষয়ে কথা বলা হচ্ছে না, যদিও এটি আবার পরিষ্কার করা দরকার যে তারা আদতে কোনো হুমকিই নয়। সৈন্য সংখ্যা বা সামরিক সরঞ্জামের অসমতার কথা না হয় না-ই তুললাম। স্রেফ গুণগত দিক থেকে বিচার করলে, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কেবল দুটি কাজে তাদের অসীম পারদর্শিতা অতি বীরত্বের সাথে প্রদর্শন করেছে: আদিবাসী নারীদের ধর্ষণ করা২, এবং গলফ খেলা। অবশ্য সেনা কর্মকর্তারা আবার নাকি হোটেল ব্যবসায় মোটামুটি চলনসই, অবশ্য কক্সবাজারের উন্নত রিসোর্টগুলোর তুলনায় ‘র্যাডিশন ব্লু’ আহামরি কিছু নয়।
একটি সেনাবাহিনীর কাছ থেকে প্রত্যাশিত কাজগুলোর ক্ষেত্রে এদের দক্ষতার চিত্রটা বেশ মর্মান্তিক। এটি সেই বাহিনী যারা রুয়ান্ডা গণহত্যার সময় সাবান ছাড়াই (এটি কোনো টাইপো নয়) সেখানে গিয়ে উপস্থিত হয়েছিল। জাতিসংঘ কমান্ডার রোমিও ডালেয়ার এদেরকে ‘ঈষৎ কম অপদার্থ’ বলেই গণ্য করতেন; এদের না ছিল সাহস, না ছিল পেশাদারিত্ব। এমনকি নির্দেশ অমান্য করার উসিলায় এই বীরপুরুষেরা মাঝেমধ্যে নিজেদের গাড়ি নিজেরাই নষ্ট করে ফেলত। ১৯৯৪ সালের ২০ এপ্রিল ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’-এর আন্তর্জাতিক সংবাদের প্রথম পাতায় সেই ছবি ফুটে উঠেছিল: “বাংলাদেশি অফিসার আর এনসিওরা— তাদের সাধারণ সৈনিকদেরকে পরের প্লেনের জন্য ফেলে রেখে… পালিয়ে বাঁচার জন্য একটি উদ্ধারকারী বিমানে হুড়োহুড়ি করে ওঠার চেষ্টা করছে… একপাল গৃহপালিত ভীতু গরু-ছাগলের মতো।”৩
সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখেছি যে নিরাপত্তা বাহিনী মৌলিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থ হচ্ছে, সীমান্তে রাজনৈতিক খুনিদের ধরতে ব্যর্থ হচ্ছে এবং গোটা একটা স্কুল ধ্বংস না করে একটা সহজ-সরল অবতরন-উড্ডয়ন মহড়া পর্যন্ত পরিচালনা করতে ব্যর্থ হচ্ছে (র্যাডিশন ব্লুর অতিথিরা দয়া করে বিশেষ নজর দিবেন)।
ধর্ষণ আর গলফ—বছরে ৪০ হাজার কোটি টাকা বাজেট পাওয়া বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর দৌড় এই পর্যন্তই। এটি সেই সাহসী পাইলটের প্রতি কোনো অপমান নয়, যিনি স্কুলটাকে আঘাত করা এড়াতে তাঁর সাধ্যমতো চেষ্টা করেছিলেন, অথবা সম্প্রতি সুদানে নিহত হওয়া ছয়জন শান্তিরক্ষীর প্রতিও অপমান নয়। প্রকৃতপক্ষে, অপমানটা হয়েছে এই ব্যক্তিদের মৃত্যু সম্পর্কিত কোনো তদন্ত ছাড়াই তাদেরকে পূর্ণ মর্যাদার সাথে দাফন করায়। যে যদি তাঁদের নেতারা মাঝারি মানের হোটেল পরিচালনায় অল্প একটু কম সময় দিয়ে সৈনিকদের সৈনিক হওয়া শেখানোতে আর বিমানকর্মীদের বিমান রক্ষণাবেক্ষণের প্রশিক্ষণে একটু বেশি সময় দিতেন, তবে এই ভয়াবহ ঘটনাগুলো এড়ানো যেত কিনা।
পরিশেষে, যদিও আমার মূল মনোযোগ দেশের শিশুদের হত্যার ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী এযাবত যে দায়মুক্তি ভোগ করে এসেছে তা নিয়ে; তবুও তারা এই কাজটিও কতটা অদক্ষতার সাথে করেছে তা-ও পাশ কাটিয়ে যাওয়ার মতো নয়। এই পর্যবেক্ষণটি ব্যক্ত করার মানে এই নয় যে এতে গণহত্যার ভয়াবহতা কিংবা ১৪০০ আন্দোলনকারীর আত্মত্যাগ ও তাঁদের পরিবারের দুঃখকে খাটো করা হচ্ছে।
দুই সপ্তাহে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনী তুলনামূলকভাবে কম সংখ্যক নিরস্ত্র শিশুকে হত্যা করতে সক্ষম হয়েছে, যদি আমরা ১৯৮৯ সালের ৪ঠা জুন তিয়েনানমেন স্কয়ার ও তার আশেপাশে চীনারা মাত্র একদিনে যা করেছিল, তার সর্বনিম্ন হিসাবের সাথে তুলনা করি।৪ এই বছরের ২৫ জানুয়ারি টাইম ম্যাগাজিন রিপোর্ট করেছে যে, ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ সূত্রের মতে কেবল ৮ ও ৯ জানুয়ারিতেই সেদেশের নিরাপত্তা বাহিনী ‘প্রায় ৩০,০০০ মানুষকে’ হত্যা করে থাকতে পারে। উল্লেখ্য যে, ইরানের জনসংখ্যা বাংলাদেশের মাত্র অর্ধেক।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাজারটা দোষ থাকতে পারে, কিন্তু তাদের সৈনিকরা তো আর নিরস্ত্র শিশুকিশোর নয়। তা সত্ত্বেও, ভারতকে ব্যবহার করা হবে বাংলাদেশীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার অসম্ভাব্যতা থেকে জন্ম নেওয়া ক্রোধকে উগরে দেওয়ার একটা পথ হিসেবে। দ্বিতীয় লক্ষ্য হবে সংখ্যালঘু, আর তৃতীয় হবে নারী। এদেরকে বাংলাদেশিদের হাতে সেভাবে তুলে দেওয়া হবে, ঠিক যেভাবে চা-শ্রমিকদের একমাত্র ওষুধ হিসেবে সবসময় ধরিয়ে দেওয়া হয় নাপা প্যারাসিটামল, কিংবা নারীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় তাদের পুত্রবধূদেরকে, অথবা পুরোনো আমেরিকার কনফেডারেট রাজ্যগুলোতে দরিদ্র শ্বেতাঙ্গদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হতো দাসত্বে আবদ্ধ আফ্রিকান-আমেরিকানদের। আম্বেদকর এই স্তরীভূত বিন্যাসকেই জাতপ্রথা টিকিয়ে রাখার রহস্য হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন; আর এটি যেকোনো স্থিতিশীল নিপীড়নের ক্ষেত্রেই সত্য। যখন একটি “নিম্নস্তরের মানুষ তার চেয়েও নিম্নস্তরের কারো তুলনায় বিশেষ সুবিধা পায়… তখন প্রতিটি শ্রেণিই সেই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে আগ্রহী হয়ে ওঠে।”৫
আমি ভারতীয় মিডিয়ার ডানপন্থী হিস্টিরিয়াতে পড়ে যাওয়াকে ক্ষমা করে দিচ্ছি না, কিংবা ভারত সরকারের দম্ভ ও তুচ্ছজ্ঞান করাকেও নয়। আমি হাসিনার অপরাধের তীব্রতা নিয়ে প্রশ্ন করছি না, কিংবা তাঁর বর্তমানের আশ্চর্যজনক বিপজ্জনক আচরণকেও সমর্থন করছি না। তা সত্ত্বেও, হাসিনার সঙ্গে ভারতের ব্যক্তিগত কিংবা আওয়ামী লীগের সাথে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক যে ঐতিহাসিক সম্পর্ক— কেবল তা দিয়ে তাঁকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধকে ভারতের বারবার প্রত্যাখ্যান করার ঘটনাটি পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না।
তাদের এই প্রত্যাখ্যানের সুরের মধ্যে একজন অভিজ্ঞ মদ-পরিবেশকের একটা ভাব আছে; যেন তিনি বলছেন, ‘দুঃখিত স্যার, আর না, আপনি আজ অলরেডি অনেক বেশি গিলে ফেলেছেন।” কারণ, এটাও যথেষ্ট হবে না।
কারণ, ভারতীয়রা অন্য সবার মতোই স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে যে, এই পুরো জিনিসটা আসলে ন্যায়বিচারের ধারেকাছেও নেই।
এটি যদি আসলেই ন্যায়বিচার কিংবা আত্মবলিদান করা শহীদদের সম্মান জানানোর বিষয় হতো, তবে জুলাই অভ্যুত্থানে নারীদের অংশগ্রহণকে তাঁদের রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে এভাবে পরিকল্পিতভাবে, কাঠামোগতভাবে আড়ালে ঠেলে দেওয়া হতো না। ছাত্র আন্দোলনের পিঠে চড়ে গঠিত হওয়া দল এনসিপি-র বিশ্বাসঘাতকতা হলো সবচেয়ে তিতকুটে উদাহরণগুলোর একটি, যেভাবে বর্তমান পরিস্থিতির ওপর সুস্মিতা প্রীথা তাঁর অনবদ্য সমালোচনার পরিশেষে লিখেছেন, “পুরুষেরা এবার দায় ও দরদের সাথে বাকি দায়িত্বটুকু বুঝে নেবে। অন্তত পরবর্তী অভ্যুত্থান আসার আগ পর্যন্ত, তখন নারীদের আবারও জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন পড়বে।”
এটি যদি আসলেই ন্যায়বিচারের বিষয় হতো, তবে প্রমাণ ছাড়াই, অনেক ক্ষেত্রে চার্জ ছাড়াই, ডজন ডজন, এমনকি “হয়তো শত শত,” কমিউনিস্ট, আইনজীবী এবং আমলাকে হাসিনা সরকারের সহযোগী সাজিয়ে গ্রেপ্তার করা হতো না। সাংবাদিকতা হত্যার ‘উস্কানি’ দিয়েছে—এমন অভিযোগে ২৬৬ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে খুনের মামলাও দেওয়া হতো না।
এটি যদি আসলেই ন্যায়বিচারের বিষয় হতো, তাহলে সেনাবাহিনী আর গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ডিজিএফআই-এর পাঁচজন মহাপরিচালক এবং ১৮৭ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে বীরদর্পে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে দিতো না।
এটি যদি আসলেই ন্যায়বিচারের বিষয় হতো, তবে সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান জনগণের টাকায় নিজের গলফ খেলার অপারদর্শিতা ঠিক করার সুযোগ পেতেন না, আর গত নভেম্বরে প্রধান উপদেষ্টার হাত থেকে ‘সেনাবাহিনী পদক’ও পেতেন না।
হাসিনা, আমাদেরকে বলা হয়, ছিলেন একজন ফ্যাসিস্ট। কিন্তু এ এক অদ্ভুত রকমের ফ্যাসিজম, যেখানে নেতার হাতে নেই সেনাবাহিনীর কোনো নিয়ন্ত্রণ। এ এক অদ্ভুত রকমের শ্রদ্ধাজ্ঞাপন সেইসব দীর্ঘ জুলাইয়ের শহীদদের প্রতি, যেখানে তাদের হত্যাকারীদের সম্মান জানানো হচ্ছে, অথবা সেই খুনীরা “যতটুকু করেছে তার চাইতে আরও অনেক বেশি শিশুদেরকে খুন করতে পারতো, কিন্তু তাদের হৃদয়ে থাকা দায় ও দরদের কারণে করেনি,” এই যুক্তিতে তাদের স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে। নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালে হারমান গোয়েরিংকে কিন্তু পূর্ণ পেনশনে অবসরে যেতে দেওয়া হয়নি। তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, যেমনটা দেওয়া হয়েছিল নাৎসি জার্মানির সামরিক বাহিনীর টিকে থাকা অধিকাংশ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদেরকে (গোয়েরিং নিজে তার কয়েদকক্ষে আত্মহত্যা করেছিলেন)। এমনকি নৌবাহিনীর প্রধান কার্ল ডনিটজকে দেওয়া হয়েছিল দশ বছরের কারাদণ্ড—যা ছিল তখনকার সবচেয়ে লঘু দণ্ড। অথচ সেই ‘লঘু’ দণ্ডও আমাদের সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের সাজার তুলনায় দ্বিগুণ।
১৯৪৫ সালের জার্মান সংবাদমাধ্যম কীভাবে খুনি গেস্টাপো বা শুটস-স্টাফেল (এসএস) বাহিনীকে সংস্কার করে ভালো মানুষ বানানো যায় তা নিয়ে হাত কচলায়নি। এই বাহিনীগুলোকে বাতিল করা হয়েছিল এবং এদের সদস্যদের অপরাধী হিসেবে গণ্য করা হয়েছিল। গোপন পুলিশের পরিবর্তে এখন জার্মানির একটি অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা রয়েছে, যা বিচারিক তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয় এবং যুক্তরাজ্যের Mi5-এর মতো এদের শুধু তদন্ত করার ক্ষমতা রয়েছে; মানুষকে গ্রেপ্তার বা আটকে রাখার কোনো ক্ষমতা নেই।
সাবেক সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ভূঁইয়া সম্ভবত বাংলাদেশের নিজস্ব আধাসামরিক বাহিনী এবং দেশীয় মা-মাটি-ও-মোহনার গেস্টাপো, অর্থাৎ র্যাব ও ডিজিএফআইকে বিলুপ্ত করার পক্ষে সবচেয়ে বিশিষ্ট কণ্ঠস্বর। কিন্তু এ প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেখা যাচ্ছে বেশ বহাল তবিয়তেই ছড়ি ঘোরাতে দেওয়া হবে। আমাদের নোবেলজয়ী ইউনূস সাহেবও মনে হয় এই জল্লাদদের সেবা ছাড়া চলতে পারবেন না। তিনি আবার দুনিয়ার ধনাঢ্য দেশগুলোর কাছে জলবায়ুর উছিলায় ক্ষতিপূরণ চেয়ে গলা ফাটান, আর অন্যদিকে দেশের আমজনতা তাদের রক্ত জল করা ট্যাক্সের টাকায় সেইসব সরকারী কর্মচারী ওরফে পেশাজীবি অত্যাচারীদেরকে বেতন দিতে বাধ্য হচ্ছে, যারা দিনরাত মানুষের জান-মাল নিয়ে ছিনিমিনি খেলে।
এই বাস্তবতাটি দীর্ঘ জুলাইয়ের বিদেহী আত্মাদের প্রতি হাসানুল হক ইনুর বিষাক্ত, বিদ্রূপাত্মক নিবেদনের সাথে চরমভাবে সাংঘর্ষিক। তাদের দাবি মোতাবেক হাসিনার খলনায়কত্ব অনন্য, অদ্বিতীয়, তিনি ইবলিশ; কিন্তু তাঁকে দেশ থেকে নির্মূল করার পরেও শাসনব্যবস্থার কাঠামোগত অপরিবর্তনীয়তা সেই দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এই অসংগতির খাঁজকাটা ছুরি জনমনে সবকিছুর অর্থ আর তাৎপর্য নিয়ে এক গভীর বিভ্রান্তির ক্ষত রেখে গিয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক উদাহরণগুলো আমাদের সেই অভিজ্ঞ মদ-পরিবেশক সাহেবের সাথে একমত: “এমনকি হাসিনাও যথেষ্ট হবে না। স্বৈরাচারের আসল শিকড় অনেক গভীরে গাঁথা, আওয়ামী লীগের বাঙালি জাতীয়তাবাদে, হিন্দুধর্মে এবং কবিঠাকুরের (অর্থাৎ ভারত ও সংখ্যালঘুদের) মধ্যে।”
এবাদুর রহমান সাহেব আবার এক চমৎকার নজির স্থাপন করেন যখন তিনি বাংলাদেশের ভিত্তিগত জাতীয়তাবাদের ‘সভ্যতাগত ব্যাকরণ… নান্দনিক সার্বভৌমত্ব’ এবং ‘জাদুঘরীয় কাঠামো’ ভেঙে ফেলার পক্ষে যুক্তি দেন। মববাজদের ছায়ানট ধ্বংস করা আর বাংলাদেশের ইউনিভার্সিটির শিক্ষকদেরকে হেনস্তা করার পক্ষে এরকম পরোক্ষ সাফাই গাওয়া অতি-পণ্ডিতি তেলবাজি আমি খুব কমই দেখেছি।
নিজেকে একজন বিউপনিবেশায়ক সাংস্কৃতিক তাত্ত্বিক এবং বৌদ্ধ পণ্ডিত হিসেবে পরিচয় দেওয়া রহমান সাহেব স্পষ্টতই মওদুদীবাদে অভিজ্ঞ। রেজা নাসরের মওদুদী এবং জামায়াতে ইসলামীর সংস্কৃতি-সম্পর্কিত আচ্ছন্নতা নিয়ে লেখা বিশ্লেষণটি বিবেচনা করুন: “সাম্রাজ্যবাদের মূল সমস্যা, যা মওদুদীর মতে… হিন্দুত্ববাদের ত্রাস তৈরি করেছিল, তা ছিলো মূলত সাংস্কৃতিক… এর শয়তানী ছিল নারী মুক্তি, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং জাতীয়তাবাদের মতো নৈতিক ও নীতিগত অশুভশক্তির প্রচার, যার সবকটাই ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী ছিল… তিনি অর্থনৈতিক মুক্তির চেয়ে বেশি চিন্তিত ছিলেন পোশাক, ভাষা এবং রীতিনীতি রক্ষায়… মুসলিম সংস্কৃতিকে সুরক্ষিত রাখা নিয়ে।” [৬]
দুর্যোগ-পূর্ববর্তী ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সাফল্যের পেছনে পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তারা হিন্দু আধিপত্য এবং ভারতীয় ষড়যন্ত্রকে মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। নিজেদের করা পৈশাচিক গণহত্যার পক্ষে সাফাই গাইতে এই অজুহাতটি আবার জেনারেল নিয়াজি ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত তার আত্মকেন্দ্রিক এবং দুঃখবিলাসী স্মৃতিকথায় কোনো পরিবর্তন বা ক্ষমা প্রার্থনা ছাড়াই পুনরাবৃত্তি করেছেন, যেখানে তিনি ‘হিন্দু-নিয়ন্ত্রিত বাঙালিদের’ দ্বারা পশ্চিম পাকিস্তানিদের ‘শোষণ’ করার নিন্দা জানিয়েছেন।৭
কিন্তু রহমানের প্রবন্ধের দুর্বলতা কেবল আবুল আ’লা আল-মওদুদী এবং লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজির লেখা থেকে (নিঃসন্দেহে কাকতালীয়) চুরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ধর্ম নিরপেক্ষতার ‘আধিপত্যবাদ’ নিয়ে তার আলোচনা আপনাকে এমন বিভ্রান্তিকর ধারণা দিতে পারে যেন নাস্তিক, সমকামী এবং ট্রান্সজেন্ডাররা মিলেমিশে রাস্তায় রাস্তায় মুসলমানদের কেবল মুসলিম হওয়ার কারণে কুপিয়ে জবাই করে ফেলছে, উল্টোটা নয়।
‘আধিপত্যবাদী’ ধর্মনিরপেক্ষতা যে প্রক্রিয়ায় “অন্যান্য বঙ্গীয় জীবনমণ্ডলকে চিরস্থায়ীভাবে অবৈধ প্রতিপন্ন করে,” তার সমালোচনা করতে গিয়ে রহমান অ-বাঙালি বাংলাদেশিদের জীবনমণ্ডলকে পুরোপুরি মুছে ফেলেন। একজন স্বীয়-স্বীকৃত বৌদ্ধ পণ্ডিত ও বিউপনিবেশায়ন তত্ত্ববিদের কাছ থেকে এমন জিনিস আসা কিঞ্চিৎ অদ্ভুত বটে। হয়তো নিজের অজান্তেই তিনি সেই বিভীষিকাময় ফ্যাসিবাদী খলনায়ক বঙ্গশত্রু শেখ মুজিবের সাথে একমত হয়ে আদিবাসীরা ‘এখন সবাই বাঙালি’ হয়ে গেছে বলে বিশ্বাস করেন।
রহমান সাহেবের যত খুশি ততগুলো হারমোনিয়াম মাটিতে ফেলে পা দিয়ে ডলে তক্তা বানিয়ে ফেলার স্বাধীনতা অবশ্যই আছে, সাধু-সন্ন্যাসী সেজে এডওয়ার্ড সাইদের লেখাকে শূলে চড়িয়ে নিজের এই ধ্বংসকামিতাকে উপনিবেশবাদবিরোধী সাধনা আখ্যায়িত করার মহৎ অভিনয়ের স্বাধীনতাও অবশ্যই আছে। কিন্তু এটাও কখনো যথেষ্ট হবে না। “দুঃখিত স্যার, আর না, আপনি আজ অলরেডি অনেক বেশি গিলে ফেলেছেন।”
কারণ সেই ক্রোধটা কখনো স্মৃতিতে পরিণত হতে পারবে না।
ক্রোধ একটি জটিল বিষয়। এটি এক অপূর্ণ প্রত্যাশার হাহাকার, এক অবাধ্য পৃথিবীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। এটি মস্তিষ্কের অস্ত্রাগারে রাখা প্রতিটি স্নায়ু-রাসায়নিক উপাদানকে তলব করে; সেরোটোনিন, কর্টিসল, ডোপামিন, অ্যাড্রেনালিন। ক্রোধ এটি করে আমাদের অসহায়ত্ব বা অক্ষমতার বোধকে নাকচ করার জন্য, আমাদেরকে লড়াই করার সামর্থ্য দিতে, নিজেদের স্বকীয়তা রক্ষা করতে, আঘাত প্রতিহত করতে, আঘাতের প্রতিশোধ নিতে।
ক্রোধ মস্তিষ্কে একটি ‘ওপেন লুপ’ তৈরি করে। এই লুপটি বন্ধ করতে হলে আমাদের অনুভব করতে হবে যে আমরা আর বিপদে নেই। বাস্তব সামাজিক প্রেক্ষাপটে এর অর্থ হলো, যারা আমাদের ক্ষতি করেছে, হয় তাদের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে, অথবা তাদেরকে এমন একটা অবস্থায় রাখতে হবে যাতে তারা পুনরায় আমাদের ক্ষতি করতে না পারে। খুনের মতো অত্যন্ত গুরুতর ক্ষেত্রে এর সুরাহা সাধারণত কারাদণ্ড হয়। এই ধরনের সমাধান ছাড়া ক্রোধকে ‘ছেড়ে দেওয়া’ বা ভুলে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন, আর এর জন্যই তাদের প্রয়োজন অর্থ আর তাৎপর্যের সেই নতুন রূপান্তর যা বর্তমানে বাংলাদেশের জনপরিসরের সংলাপে চলছে।
আমি ‘অত্যন্ত কঠিন’ বলছি, তবে এটি তখনই প্রাসঙ্গিক যখন সময়ের ব্যবধানে ক্ষতের স্মৃতির তীব্রতা কমে আসে, যখন আমাদের মন সময়ের মলম দিয়ে সেই লুপটিকে বন্ধ করার সুযোগ পায়। এই প্রক্রিয়ায় প্রায়ই মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসার মতো আরও পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। অন্যথায়, যদি অভিজ্ঞতার কোনো নতুন বয়ান বা অর্থ তৈরি না হয়, তবে ক্রোধ অমরত্ব লাভ করে, বারবার ফিরে আসে। আইআইএলডি-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভুক্তভোগীরা একটি বিশেষ ধরনের ‘ক্লান্তি’র কথা জানিয়েছেন; “বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও সভায় বারবার তাদের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে বলা হয়, যা তাদের জন্য অস্বস্তিকর এবং পুনরায় মানসিকভাবে আঘাত পাওয়ার মতো।” আমার আশঙ্কা, এই বিগত স্বৈরাচারের ভুক্তভোগীদের ব্যবহার করা হচ্ছে একটি রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে, আমাদের দৃষ্টি সরিয়ে দেওয়ার জন্য, যাতে আড়াল করা যায় এই ভয়ানক ন্যায়বিচারহীন, পরিবর্তনহীন, বিরামহীন বর্তমানকে যেটি ক্রোধকে কোনো অন্তিমতার অনুমতি দেয় না।
আমরা মনে হয় মাঝে মাঝে ভুলে যাই যে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন এই অভ্যুত্থানটি ছিল চাকরি সংক্রান্ত। স্বাধীনতার চেয়ে এটি আরও বড় একটি পরিমাপযোগ্য বাস্তব সমস্যা, এমন একটি সমস্যা যেখানে আমরা আসলে কী নিয়ে কথা বলছি সে বিষয়ে একমত হওয়া অনেক সহজ। স্বাধীনতার মতো বিমূর্ত ব্যক্তিনিষ্ঠ একটি ধারণা বা, খোদা মাফ করুক, কোনো সাচ্চা ইনসাফ চাওয়া মজলুমের হাতে জ্বালিয়ে দেওয়া সংবাদভবনে পুড়ে না মরে একজন সাংবাদিকের ডেস্কে বসে কাজ করার ক্ষমতার তুলনায় চাকরি তো অনেক বেশি সুনির্দিষ্ট ও পার্থিব।
বর্তমান আলোচনায় চাকরি এবং কর্মসংস্থানের বিষয়টি প্রায়ই অর্থনীতিতে গিয়ে ঠেকে, কিন্তু এর একটি গভীরতর সামাজিক দিক রয়েছে। আহমেদ হোসেন এবং দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য উভয়েই তরুণদের বেকারত্বের আলোচনার মধ্যে ‘মানবিক মর্যাদা’র অস্বস্তিকর বিষয়টি তুলে ধরেছেন। আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থায় পারস্পরিক সম্পর্কগুলো মূলত কর্তৃত্ববাদ, দাসত্ববাদ, আনুষ্ঠানিক অপমান আর তোষামোদির এক নাটকীয় প্রদর্শনী। অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল এই সামন্ততান্ত্রিক ‘রাজা-প্রজা’র মানসিকতাকে রাষ্ট্রের সকল অশুভের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন; যদিও বর্তমানের এই চরম অবনতিকে তাদের আমলের সাথে তুলনা করলে মুঘল বা নবাবদের প্রতিই একটু অন্যায়ই করা হয়।
নিম্ন-মধ্যবিত্ত তরুণ প্রজন্মের কাছে শিক্ষার মাধ্যমে সামাজিক ও পেশাগত মর্যাদা অর্জনের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবে ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে। এর পরিবর্তে তারা পেয়েছে বেকারত্ব, কোনোমতে চাকরি পেলেও তা দুর্বিষহ কর্মপরিবেশে। তাদেরকে মনিবের হাতে ক্রীতদাসের মতো আচরণ সহ্য করে নিয়ে নিজেদের ভাগ্যবান ভাবতে বলা হয়েছে। শ্রমের অবমূল্যায়ন, বিলম্বিত বেতন বা পারিশ্রমিকের পরিবর্তে পণ্যের মাধ্যমে পাওনা মেটানোর মতো শোষণকে মেনে নিতে বলা হয়েছে।
সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘মব’ আমাদের সমাজবাস্তবতার এক নিগূঢ় সত্য প্রকাশ করে। এটিই একমাত্র মাধ্যম যার মাধ্যমে অনেক বাংলাদেশী রাজনৈতিক কর্তৃত্ব অথবা নিজেদের জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণের বোধ অনুভব করে। সম্ভবত আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি এমন এক বিরল ক্ষেত্র যেখানে মানুষ সাম্যের অনুভূতি পায়। এখানে কোনো অনুনয়-বিনয় বা পা ছুঁয়ে সালাম করা নেই। কোনো ‘জি স্যার, জি স্যার’ নেই।
বাংলাদেশের অফিস-আদালতে যা জোটে না, রাজপথের মিছিলে সেই সম্মানটা অন্তত বিমূর্তভাবে মেলে। আর উপরি পাওনা হিসেবে এই জনতার অংশ হওয়া মানে জ্যান্ত পুড়ে মরে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে এক প্রকার সুরক্ষা পাওয়া, যে গ্যারান্টিটা না আছে পোশাক শ্রমিকদের জন্য, আর গত ডিসেম্বর থেকে না আছে সাংবাদিকদের জন্য।
নির্বাচনের আগে এসব নিয়ে অনেক কথা হয়েছে, বিদ্যমান রাজনৈতিক শক্তিগুলো এই কাঠামোগত সহিংসতাকে স্বীকার করেনি এবং এটি পরিবর্তনের কোনো কৌশলও খুঁজে বের করেনি।
জনগণ রাজপথে নেমেছিল কারণ যে পনেরোটির মতো প্রভাবশালী পরিবার দেশটির মালিক, তারা জাতীয় অর্থনীতিকে শোষণের চারণভূমি বানিয়ে রেখেছে। রেহমান সোবহানের ভাষায়, বাংলাদেশ “অভিজাততন্ত্রের শাসনে থাকা একটি চরম বৈষম্যমূলক সমাজ।“ শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অবকাঠামোতে বিনিয়োগ অত্যন্ত অপর্যাপ্ত এবং শ্রমিকদের অধিকার কার্যত নেই বললেই চলে। তরুণরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে বসে দূষিত বাতাস গ্রহণ করে সেইসব স্বল্প বেতনের চাকরিতে যোগ দিতে যাচ্ছে যেখানে তাদের সাথে গোলামের মতো আচরণ করা হয়। হাসিনা চলে গেছেন, কিন্তু এই সমস্যাগুলো ঠিকই রয়ে গেছে।
দীর্ঘ জুলাইয়ের সেই বীভৎসতা আর সহযোদ্ধাদের গণহত্যার কথা বিস্মৃত হতে চাইলে বাংলাদেশিদের প্রথমেই ভুলে যেতে হবে যে এই হত্যাকাণ্ডের জন্য যারা স্পষ্টত সরাসরি দায়ী তারা কিন্তু দিব্যি বেঁচে আছে, মুক্ত আছে এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারগুলোর চেয়ে ঢের স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করছে।
কিন্তু বাংলাদেশিদেরকে ভুলে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। বরং তাদেরকে আদেশ করা হচ্ছে, মনে রাখতে। খুব ভালো করে মনে রাখতে এবং খুব অনুগত হয়ে কৃতজ্ঞ থাকতে।
মানব-কসাইদের এই সংযমের জন্য তাদের কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত, যাকে অধ্যাপক নাওমি হোসেন “বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিরল মহত্ত্ব” বলে আখ্যা দিয়েছেন।
কত অল্প মানুষকেই না কসাইরা জবাই করেছে, আর সেই রক্তস্নানের পর কসাইরা পরম মমতায় গণতন্ত্রকে দায় ও দরদের সাথে আগলে রেখে রক্ষা করেছে। পরিস্থিতি আরও অনেক বেশি ভয়াবহ হতে পারত। পরেরবার হয়তো পরিস্থিতি আরও অনেক, অনেক বেশি ভয়াবহ হবে।
বরং এটাই বিশ্বাস করে নেওয়া ভালো যে, দায়বদ্ধতার এই বর্তমান বণ্টন অপরাধের মাত্রার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ; আর বিচারহীনতার চেয়ে পক্ষপাতমূলক বিচারই শ্রেয়। আমরা বরং এটাই কল্পনা করে নেই যে, হাসিনা নিজেই তার দলের অশীতিপর বুড়ো আমলা, সাবেক বামপন্থী আর রক্তপিপাসু সাংবাদিকদের পাল নিয়ে রাস্তায় নেমে শিক্ষার্থীদের বুক গুলি দিয়ে ঝাঁঝরা করে ফেলেছিলেন।
মাহফুজ আনাম যেমনটা নিরুত্তাপভাবে মন্তব্য করেছেন, “আততায়ী সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সারা বিশ্বে নেতৃত্বদানকারী দেশ হিসেবে এক অনন্য নজির স্থাপন করবে।”
প্রচলিত বয়ানকে প্রশ্ন করা একটি ঝুঁকিপূর্ণ চর্চা, যা ইউনূসের প্রেস সচিব শফিকুল আলমের বক্তব্যে ফুটে উঠেছিল। মানবাধিকার লঙ্ঘনের খবর প্রচার করায় সংবাদমাধ্যমের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি উল্লেখ করেন যে, “অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে সংবাদমাধ্যম ব্যাপক স্বাধীনতা লাভ করেছে।”
আইনি মারপ্যাঁচে এটি দেখা জরুরি হতে পারে যে তিনি কথাগুলো ব্যক্তিগতভাবে বলেছিলেন নাকি সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে। কিন্তু আসলে তাতে কিছু যায় আসে না। জনাব আলম সম্ভবত এটি বুঝতে পারেন নি যে, সংবাদমাধ্যমের এই অবারিত স্বাধীনতার উৎস হলো গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান।
তোষামোদ বা প্রশংসার বিনিময়ে এই ধরনের স্বাধীনতা বিক্রি করার অধিকার কোনো সরকারেরই নেই। আগের কোনো সরকার যে এই ন্যূনতম দায়বদ্ধতাটুকু দেখাতে পারেনি তা বর্তমান আলোচনার বিষয় নয়।
সবচেয়ে বড় কথা হলো, এই স্বাধীনতা কারো দান-খয়রাত থেকে পাওয়া নয়। এগুলো টিক্কা খান, নিয়াজি, আল-শামস আর আল-বদরের জল্লাদ বাহিনীর হাত থেকে জোরপূর্বক কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, মৃত পাঞ্জাবি সৈন্যদের নিথর আঙুলের ফাঁক থেকে এগুলোকে ছিনিয়ে আনা হয়েছিল।
জনগণের জন্য এই বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা, আর তাঁদের নাম ভাঙিয়ে করা কোনো বীভৎস কাজই এই ধ্রুব সত্যকে বদলে দিতে পারবে না।
অন্তর্বর্তী সরকার ছিল সেই স্বাধীনতার স্রেফ একজন পাহারাদার, যা তিনি পরিষ্কারভাবেই বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন।
আন্দোলনের সময় ১৬ বছরের এক কিশোরীর মাথায় গুলি করা সেই একই পুলিশ বাহিনীর রিপোর্টকে ধ্রুব সত্য হিসেবে মেনে নিয়ে জনাব আলম আগের আমলগুলোর মতোই নিজের পরিচয় জাহির করলেন; যেখানে রাষ্ট্র মনে করতো অসীম ক্ষমতাধর নিরাপত্তা বাহিনীর কাজ হলো নাগরিক সমাজকে দমিয়ে রাখা, অথচ হওয়ার কথা ছিল তার বিপরীত। হাসিনা থাকলে নিঃসন্দেহে এখন একটা হাততালি দিতেন।
১৯৪৭ সালকে গণনায় রাখলে, বাংলাদেশিরা এ যাবত মোট তিনবার নিজেদেরকে মুক্ত করেছে। জনগণের এই সেবককে ‘প্রজা’দের স্পর্ধা ও বেয়াদবির জন্য তাদেরকে ধমকাতে দেখে, এবং সংবাদমাধ্যমের ওপর সেন্সরশিপ ও নিপীড়ন থেকে বিরত থাকার জন্য কৃতজ্ঞতা আশা করতে দেখে, আমার মনে প্রশ্ন জাগে যে সাধারণ মানুষ কি সত্যিই মনে করে তারা তাদের সরকারের দ্বারা শেষমেশ ভালোভাবে সেবাপ্রাপ্ত হয়েছে?
আর যদি তারা তা মনে না করে, তবে এই দায় কার? হাসিনার? আগামীকাল যদি আমরা হাসিনাকে ফাঁসিকাঠে ঝুলাই, দেশের এইসব শফিকুল আলমদের মধ্যে কি হঠাৎ করে নাগরিক দায়িত্ববোধ ও জনসেবার মানসিকতা জেগে উঠবে? তারা কি অবশেষে ‘রাজা-প্রজা’র সংস্কৃতি ত্যাগ করবে?
শফিকুল আলমের এই মন্তব্যের দুইমাস পরেই তার সরকার চরমভাবে ব্যর্থ হয় সেইসব তথাকথিত মজলুম জনতার হাত থেকে মিডিয়াকে বাঁচাতে, যারা ইনসাফ নামক গুপ্তধন আবিষ্কার করতে ডেইলি স্টার এবং প্রথম আলোর অফিস পুড়িয়ে দেয়। সংবাদমাধ্যমের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ আরও পাকাপোক্ত করতে তার সরকার যে নীতিমালার প্রস্তাব করেছিল, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ তাকে আখ্যা দিয়েছিল এক ‘বিদায়ী উপহাস’ হিসাবে।
৭ ফেব্রুয়ারি, শনিবার রাত সাড়ে নয়টায়, পুরোপুরি যুদ্ধের পোশাকে সজ্জিত সামরিক বাহিনীর সদস্যরা ‘বাংলাদেশ টাইমস’ নিউজ সাইটের অফিস থেকে ২১ জন সাংবাদিককে তুলে নেয়, তাদেরকে উত্তরা ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় সেনাবাহিনীর সমালোচনা করে লেখা সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদন নিয়ে ‘আলোচনা’ করার নামে।
খুব অদ্ভুত রকমের এক ‘ব্যাপক স্বাধীনতা’ পেয়েছিলেন সাংবাদিকরা অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে।
যদিও অতীতের সাথে বর্তমান ক্ষমতার যে অটুট যোগসূত্র, তা জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা মাহফুজ আলম প্রশংসনীয় সততার সাথেই ব্যক্ত করেছেন, তবুও এই ধরণের ধারণা জনসমক্ষে প্রকাশ করা এখনো কার্যত অসম্ভব, হাসিনা বা ‘ফ্যাসিবাদের’ দোসর হওয়ার তকমা কপালে না জুটিয়ে। এটি আমাদের পুনরায় বিএনপির বিজয়ের সাথে জড়িয়ে থাকা সেই অস্বস্তির জায়গাটায় ফিরিয়ে নিয়ে যায়; কারণ হাসিনার আগের সরকারগুলোও যে একই সমপর্যায়ের অপরাধ করেছিল, সেই সত্যটা উচ্চারণ করার পরিবেশও এখন নেই।
বাঙালি ধর্মনিরপেক্ষ বামপন্থীদের এক সিংহভাগ এই দৃষ্টিভঙ্গিকে শাসন করেছে; বিশেষ করে হাসিনার পতনের পর সংখ্যালঘুদের ওপর ঘটা সহিংসতাকে ‘সংখ্যালঘুদের উপর হওয়া সহিংসতা নয়’ অথবা ‘ভারতীয় প্রোপাগান্ডা’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার ন্যক্কারজনক চেষ্টা তারা করেছে। একই ভাবে, প্রতি দশকে কেবল সুযোগ-সুবিধার ভাগাভাগি এক হাত থেকে অন্য হাতে দেওয়ার বদলে লুটতরাজ ও পৃষ্ঠপোষকতার এই সংস্কৃতি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার দাবিতে সোচ্চার অনেক বাংলাদেশি কণ্ঠস্বরকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারেক রহমান যেন ঠিক তেমনই ছিলেন যেমন ভাবে শহিদুল আলমের বর্ণনা তাকে চিত্রায়িত করে, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করা এক মহানায়ক।
শহিদুল ভাই এই ঝুঁকিপূর্ণ জুয়ার ভয়াবহতা আদৌ বোঝেন কি না তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। মনে হয় তিনি বোঝেন, আর সে কারণেই হয়তো বা ফিলিস্তিনিদের অধিকারের প্রতি তাঁর এই নবজাত উৎসাহ, ধর্মনিরপেক্ষ বামপন্থীদের তুষ্ট করার জন্য একটি বিশেষ সান্ত্বনা পুরস্কার। তিনি কি বুঝতে পারছেন যে, এমন আচরণ করে তিনি পরোক্ষভাবে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীকেই বাহবা দিচ্ছেন, আর ফিলিস্তিনিদের প্রতি তিনি এক ধরণের তুচ্ছতাচ্ছিল্য প্রদর্শন করছেন নিজের কর্মের মাধ্যমে এই বিশ্বাস প্রদর্শন করে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে চলমান সামরিক দখলদারিত্বের চেয়ে গাজা গণহত্যা সমাধান করা বেশি সহজ।
সবশেষে যদি দেখা যায় তিনি দৃক গ্যালারিতে নিজেকে লুকিয়ে রেখে বাংলাদেশের শেষ হারমোনিয়ামটি পাহারা দিচ্ছেন সেইসব বৌদ্ধ পণ্ডিত আর বিউপনিবেশায়ন তাত্ত্বিকদের হাত থেকে রক্ষা করতে, যারা কি না ফ্যাসিবাদী বাঙালি জাতীয়তাবাদের শেষ চিহ্নকে উপড়ে ফেলতে এসেছে, তবে কি তিনি তখনো তাঁর ভূমধ্যসাগরীয় আনন্দ-সফরগুলোর দিকে ফিরে তাকিয়ে ভাববেন যে তাঁর সময় ও শক্তির শ্রেষ্ঠ ব্যবহার ছিল ওগুলোই? ফিলিস্তিনিরাও কী তাই ভাববে?
আমি আশা করি তাঁদেরকে কেউ সতর্ক করেছে, তিনি এককালে ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষেও লড়াই করতেন।
এই বাজিটি বড়ই হঠকারী, কারণ এতে নতুন প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে প্রায় এক অলৌকিক নৈতিক দৃঢ়তা পাওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে। বর্তমানে যে শোষণ চলছে, তার মূল হাতিয়ার হলো ‘হাসিনার ফ্যাসিবাদ’-এর দোহাই দেওয়া; তাকে এই দোহাই দেওয়া বন্ধ করতে হবে। তাকে এই সত্য স্বীকার করার সাহস দেখাতে হবে যে আগের বিএনপি প্রশাসনও সমপর্যায়ের অপরাধ করেছিল এবং সেই সব নিগৃহীত মানুষের বেদনার ওজন ও মূল্য তার নিজের বেদনার সমান।
রাষ্ট্র পরিচালনার এই কঠিন পরীক্ষায় উদাহরণ আর অনুপ্রেরণা হিসেবে তিনি নিজের মায়ের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করতে পারেন। যিনি তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলোতে ‘প্রতিহিংসার রাজনীতি’ বর্জনের ডাক দিয়েছিলেন। তাঁর নিজের ভুলত্রুটি বা অপকর্ম যা-ই থাকুক না কেন, এটি ছিল একটি অসাধারণ ও মহৎ বিদায়ী বার্তা এবং বর্তমানের পক্ষপাতমূলক বিচার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক প্রকাশ্য ধিক্কার।
দ্বিতীয়ত, আদিবাসীদের উদাহরণ টানা যায়, মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রধানমন্ত্রীর পিতাকে জীবন বাজি রেখে রক্ষা করেও যারা পেয়েছিলেন কেবল তিক্ত অমানবিক প্রতিদান। কিন্তু নিজেদের সাথে ঘটে যাওয়া সেই বিভীষিকা চরম শত্রুর জন্যও কামনা না করার মতো মানসিক শক্তি প্রদর্শন করে তারা সেই দলটিকেও ভোট দিয়েছেন, যারা ১৯৯৭ সালের শান্তি চুক্তির প্রত্যাখ্যান করেছিল।
দীর্ঘ জুলাইয়ের সেই উত্তাল সময়ে পাহাড়ের নেত্রী কল্পনা চাকমার একটি বাণী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বারবার ফিরে আসছিল: “পাহাড়ে যা কিছু পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করা হয়, সেগুলো ঠিক একদিন সমতলে বাস্তবায়ন হবে।”
১৯৯৬ সালের ১২ জুন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যদের হাতে অপহৃত হওয়ার পর কল্পনা আজও নিখোঁজ। তাঁর সেই ভবিষ্যদ্বাণীর এই নির্মম সত্যতা আজ এক নিদারুণ ধারাবাহিকতার অস্তিত্ব স্বীকার করার দাবি তুলে যা বিগত দশকগুলো ছাড়িয়ে আজও বর্তমানকে আষ্টেপৃষ্ঠে আঁকড়ে ধরে আছে।
প্রধানমন্ত্রীর সামনে এখন এক যুগান্তকারী সুযোগ এসেছে নিজের অভিজ্ঞতা এবং কল্পনার অভিজ্ঞতার মধ্যেকার যেকোনো অর্থবহ পার্থক্যকে নাকচ করে দেওয়ার; যদিও অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে তিনি কল্পনার তুলনায় অনেক কম লাঞ্ছিত হয়েছেন। এই সত্যটি স্বীকার করে নেওয়ার অর্থ হবে জনগণের ওপর আস্থা রাখা এবং তাদেরকে সাথে নিয়ে দেশের সুবিধাভোগী গোষ্ঠী ও তাদের পাহারাদার মাস্তান সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হওয়া। মুক্তিযুদ্ধের বয়ানগত শক্তি এখনো ফুরিয়ে যায়নি, তিনি এখনো সেটাতে ডাক দিতে পারেন। বাংলাদেশের মৌলিক জাতীয়তাবাদের এই শেকড় উপড়ানো বিউপনিবেশায়নের সাংস্কৃতিক তাত্ত্বিকদের জন্য অতো সহজ হবে না।
জামায়াতের আমীর ডাঃ শফিকুর রহমানের দাবি অনুযায়ী ১৯৭১ সালে দলটি পাকিস্তানের হয়ে কোনো সরাসরি যুদ্ধ অভিযানে জড়ায়নি। অর্থাৎ, তারা নাকি নিরপেক্ষ ছিল এবং কেবল নীতিগত জায়গা থেকে স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিল। বাহ্যিকভাবে তাঁর এই দাবি মেনে নিলেও এটি একটি আজব যুক্তি। এতে কেবল প্রমাণ হয় যে জামায়াত যুদ্ধাপরাধী ছিল না, নিছক রাষ্ট্রদ্রোহী ছিল। তাও আবার দুই দিক থেকেই—তারা সেই পাকিস্তানের সাথে বেইমানি করেছে যাদেরকে সমর্থন করলেও যাদের জন্য তারা লড়তে নামেনি, আবার সেই হবু-বাংলাদেশের সাথেও বেইমানি করেছে, যে রাষ্ট্রটিকে তারা প্রত্যাখ্যান করেছিল।
কিন্তু উচ্চমার্গীয় রাষ্ট্রদ্রোহিতা যদি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ না হয়, তবে রমেশ চন্দ্র সেনের মতো ৮৫ বছরের এক বৃদ্ধের৮ মৃত্যুর হিসাব কে দেবে? দিনাজপুরের শীতের রাতে জেলের মেঝেতে বিচারহীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু কি অপরাধ নয়? বর্তমান সরকারের অধীনে হেফাজতে মারা যাওয়া ১০০ জনেরও বেশি মানুষের কাতারে তিনি শামিল হলেন, তাঁর জামিন এবং চিকিৎসার সুযোগ প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। মানলাম তিনি আওয়ামী লীগের বড় নেতা ছিলেন, কিন্তু তাঁর মৃত্যু যদি ইনসাফ হয়, তবে হাসিনার হাতে মুশতাক আহমেদের মৃত্যু কি বেইনসাফ ছিল? হাসিনা যদি স্বৈরশাসকই হন, তবে তাঁর নিষ্ঠুর পদ্ধতিগুলো অনুরূপ অনুসরণ করে অন্তর্বর্তী সরকার কেন তাঁর আদর্শকেই তোষামোদ করলো? আর এই বিষয়ে সবাই এত নীরব কেন হলো?
এমন এক অন্তিম পরিণতির কথা কি রমেশ সেন ভেবেছিলেন যখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র সাত বছর, ১৯৪৭ সালের আগস্টের সেই মধ্যরাত্রির সাক্ষী? ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু হওয়ার এক মাসের একটু পর তিনি তাঁর ৩১তম জন্মদিন পালন করেছিলেন; তার পনেরো দিন আগেই মুক্তিবাহিনী পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম সফল এক গেরিলা যুদ্ধ শুরু করেছিল, যা শেষ পর্যন্ত নিয়াজির ইস্টার্ন কমান্ডের শ্বাসরোধ করে বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল।
জামায়াতে ইসলামী যখন অত্যন্ত ধার্মিকতার সাথে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দূরে থেকে সসম্মানে সবার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছিল, তখন নিয়াজির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সামনের সারিতে সংখ্যালঘু এবং আদিবাসীদের জোরালো উপস্থিতি ছিল, ছিলেন নারীরাও। যুদ্ধকালীন বীরত্বের জন্য দুজন নারীকে ‘বীর প্রতীক’ খেতাবে ভূষিত করা হয়েছিল, যাঁদের একজন ছিলেন খাসি আদিবাসী সম্প্রদায়ের।
বর্তমান সেনাপ্রধানের দৌড় ওই ‘সেনাবাহিনী পদক’ পর্যন্তই, যা গত বছর ইউনূস তাঁকে আদর করে উপহার দিয়েছিলেন। সেনাপ্রধান তো সেই সাহসী নারীদের মতো জীবনে কখনো কোনো যুদ্ধ করেননি। আর হ্যাঁ, মুক্তিবাহিনী ভারতের সাহায্য নিয়েই এটা করেছিল। ভারত, সংখ্যালঘু আর নারী, আজ এদের সবাইকেই যেন সান্ত্বনা পুরস্কার হিসেবে ছুড়ে দেওয়ার পাঁয়তারা চলছে, ন্যায়বিচারের বদলে ।
জীবনের একেবারে শেষ দিকের এক প্রকাশ্য আলোচনায়, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান আক্ষেপের সাথে স্মরণ করেছিলেন কীভাবে প্রতিষ্ঠাকালীন পরিকল্পনা কমিশন এমন এক দেশের রূপকল্প তৈরি করেছিল, যেখানে “…রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের প্রতিভা রাষ্ট্রের দ্বারা পরিচর্যা করা হবে।” সেই স্বপ্ন এখনও পূরণ করা সম্ভব, যা আত্মমর্যাদার জন্য সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষার মধ্য দিয়ে ১৯৯০ সালের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার হয়ে সাম্প্রতিক দীর্ঘ জুলাইয়ের সাথে যুক্ত।
প্রকৃত সংহতি ও পুনর্মিলনের যে পরীক্ষা আজ প্রধানমন্ত্রীর সামনে, তা বইতে সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষও হিমশিম খাবে। আর সেই বিদায়ী প্রধান উপদেষ্টার কথা না হয় বাদই দিলাম, যিনি এমন একটি পরাশক্তির কাছে হঠকারী নির্বোধ চুক্তিতে দেশকে আবদ্ধ করে দিয়ে গেছেন, যাদের বাড়তে থাকা পাগলামি পৃথিবীকে দিন দিন আরও অন্ধকারাচ্ছন্ন করে তুলছে।
কিন্তু যদি প্রধানমন্ত্রী শেষ পর্যন্ত সেই সাহসিকতা দেখাতে ব্যর্থ হোন এবং পিনাকী ভট্টাচার্যের অনুসারীদের প্ররোচিত করা সেই সহজ ও প্রলুব্ধকর পথে হাঁটেন, আর বাংলাদেশিদের হাতে কেবল সেই সান্ত্বনা পুরস্কারগুলোই তুলে দিতে থাকেন? তিনি যদি তাদের কাছে সব কিছু বাদ দিয়ে কেবল ভারত-বিরোধিতাকেই বড় করে উপস্থাপন করেন, তবে তাতে কার লাভ হবে?
মোদির। মোদির লাভ হবে। ঢাকাতে যদি এমন কোনো সরকার থাকে যারা ঘোর ভারত-বিরোধী এবং আদর্শগতভাবে চরম ইসলামপন্থী ও পাকিস্তান-পন্থী—তবে বিজেপি সেটা লুফে নেবে। এটিই হতে পারে বিজেপির জন্য পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী পদ দখল করার চূড়ান্ত চাবিকাঠি। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক এই ব্যর্থতা বাংলাদেশে চলমান লুটপাট আর চাটুকারিতার সংস্কৃতিকে, এবং সেই ব্যবস্থাকে পাহারা দেওয়া সেনাবাহিনীকে আরেকটা প্রজন্মের জন্য পাকাপোক্ত করে দেবে। এরপর বাংলাদেশিরা কখনোই তাদের সরকারকে দায়বদ্ধ করতে পারবে না; কারণ তখন যেকোনো ব্যর্থতাকে অনায়াসেই দিল্লির ষড়যন্ত্র বলে চালিয়ে দেওয়া যাবে। এটি হয়তো অত্যন্ত স্থিতিশীল একটি ব্যবস্থায় পরিণত হতে পারে; দুই বিপরীতধর্মী ধর্মীয় মৌলবাদী শক্তি গঙ্গা অববাহিকার দুই প্রান্ত থেকে একে অপরের দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবে, ঠিক যেভাবে সংসদ কক্ষে বিএনপি এবং জামায়াত পরস্পরের দিকে রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে থাকে, চিরশত্রু এবং অভিন্ন হৃদয়ের বন্ধু, একে অপরের স্বার্থ উদ্ধারে অনিবার্য সহায়ক।
এর মাঝেই বাংলাদেশিদের জীবন কাটবে সেই লক্কর-ঝক্কর বাসে গাদাগাদি করে পথ পাড়ি দিয়ে আর অসহ্য যানজটের বিষাক্ত বাতাসে শ্বাস নিয়ে। তাদের মনে যথেচ্ছ ক্রোধ পুষে রাখার লাইসেন্স দেওয়া হবে, যতক্ষণ পর্যন্ত সেই ক্রোধ কেবল নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুগুলোর দিকে পরিচালিত হয়। ভয়ের কিছু নেই, লক্ষ্যবস্তুগুলো তাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া হবে। এক মরীচিকার পেছনে ছুটিয়ে তাদের নিয়ে যাওয়া হবে এক দেশব্যাপী বিস্তৃত আয়নাঘরে, যেখানে ঘরের ভেতরে থাকবে কেবলই বিশ্বাসঘাতক আর বাইরে থাকবে কেবলই শত্রু। রাজাকারের কোনো অভাব হবে না; যত মন চায়, তত রাজাকার তাদের কাছে বিলিয়ে দেওয়া হবে।
এই ক্রোধ কখনো স্মৃতিতে পরিণত হবে না, আর ন্যায়বিচারের শূন্যতায় এই ক্রোধের অস্তিত্ব ভালো না কি মন্দ সেই তর্কে না গিয়েও একটা কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়: এই ক্রোধের শেকড় কবি ঠাকুর, বাঙালি জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুদের মধ্যে প্রোথিত নয়। এই ক্রোধের জন্য নারীবাদী বা সেক্যুলারিস্ট বা আদিবাসী বা সমকামী আর ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায়কেও দায়ী করা যাবে না।
এই ক্রোধের মূল উৎস হবে সেই প্রাত্যহিক এবং প্রকাশ্য আদেশ, যা বাংলাদেশিদের বাধ্য করে তাদের খুনি ও শোষকদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে।
এটি হবে এক অদ্ভুত ধরণের স্বাধীনতা।
কাঠামোগত রূপান্তর ছাড়া এটি হবে এক অদ্ভুত ধরণের বেঁচে থাকা।
অদ্ভুত। এবং গভীর আতঙ্কে ঘেরা।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: আমি ছদ্মনামে লিখছি কারণ রক্তপিপাসু সেক্যুলারিস্টদের মব আর খুনে মাস্তান সাংবাদিকদের ভয়ে আমি তটস্থ।
দ্বিতীয় বিশেষ দ্রষ্টব্য: একটু ঠাট্টা করলাম। আমি ছদ্মনাম ব্যবহার করছি কারণ, এখনো, এই মুহূর্তেও, আমাদের ঐতিহ্যবাহী খাঁটি মাটির দেশীয় গেস্টাপো বাহিনী বহাল তবিয়তে জ্যান্ত আছে।
[১] Safieh Kabir, Azfar Shafi and Saif Kazi. 2025. Inquilab Zindabad. A socialist analysis of Bangladesh after the uprisings. London: Nijjor Manush.
[২] D’Costa, Bina. 2014. Marginalization and Impunity: Violence Against Women and Girls in the Chittagong Hill Tracts. Dhaka: Chittagong Hill Tracts Commission.
[৩] Roméo Dallaire. 2003. Shake Hands with the Devil: the Failure of Humanity In Rwanda. New York: Carroll and Graf. সূচিপত্রের “Bangladeshi troops” শিরোনামের অধীনে “frustrations with” এবং “poorly equipped” দেখুন, যেখানে প্রাসঙ্গিক সকল সূত্রের একটি পূর্ণ তালিকা দেওয়া হয়েছে।
[৪] ব্রিটিশ সরকারের কাছে তাদের রাষ্ট্রদূতের পাঠানো একটি ডিক্লাসিফাইডকূটনৈতিক বার্তায় চীনের স্টেট কাউন্সিলের একটি সূত্রের বরাত দিয়ে ১০,০০০ জনের একটি সংখ্যার কথা জানানো হয়েছে। সেই সময়ে বেইজিং রেড ক্রসের অনুমান ছিল যে ২,৬০০ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। Andrew J. Nathan and Perry Link (eds). 2001. The Tiananmen Papers. London: Abacus. 507.
[৫] Dr Babasaheb Ambedkar. 2014. Writings and Speeches, vol. 5. Dr Ambedkar Foundation: New Delhi. 102.
[৬] Seyyed Vali Reza Nasr. 1996. Mawdudi and the making of Islamic Revivalism. Oxford: Oxford University Press. 49 -50.
[৭] A.A.K. Niazi. 1998. The Betrayal of East Pakistan. New Delhi: Manohar. 34.
[৮] ভিন্ন ভিন্ন সংবাদমাধ্যমে সেন সাহেবের বয়স নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দেখা গেলেও, ঢাকা ট্রিবিউন এবং উইকিপিডিয়া অনুসারে সাবেক মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন-এর জন্ম তারিখ ৩০ এপ্রিল ১৯৪০।




Leave a comment