নতুন বোতলে পুরানো সুরা: ধর্ষণের ভিকটিমের চরিত্র হনন আদালত-অনুমোদিত

‘সাক্ষ্য আইন সংশোধন ২০২২’ পুনরায় সংশোধনের দাবিতে শেকল ভাঙ্গার পদযাত্রা গত ২৯শে ডিসেম্বর রাত ১১: ৫৯ মিনিটে শাহবাগ থেকে সাংসদভবন অভিমুখে মশাল মিছিলের আয়োজন করে।আলোকচিত্র: পদ্মিনী চাকমা

১) দীর্ঘদিন ধরে নারীবাদী সংগঠনসহ আইনী সংগঠন ও অ্যাক্টিভিস্টরা ধর্ষণের ভিকটিমের চরিত্র হনন করার আইনী বৈধতার বিরুদ্ধে সংগঠিতভাবে প্রতিবাদ করে আসছেন। গত ৩ নভেম্বর ২০২২ ইং তারিখে ‘সাক্ষ্য আইন সংশোধন ২০২২’ এর মাধ্যমে ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইনের ১৫৫(৪) ধারাটি বাতিল করার বিল সংসদে পাস হয়। এই ধারা অনুসারে:-
কোনো ব্যক্তি যখন বলাৎকার বা শ্লীলতাহানির চেষ্টার অভিযোগে ফৌজদারিতে সোপর্দ হন, তখন দেখানো যেতে পারে যে অভিযোগকারিনী সাধারণভাবে দুশ্চরিত্রা।
এখন, উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে সংবাদটি যেভাবে প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে মনে হবে ধর্ষণের শিকার নারীকে আইনসিদ্ধভাবে চরিত্রহননের অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি চিরতরের জন্য ঘটে গেছে। উদাহরণস্বরূপ:- “সাক্ষ্য আইনের সংশোধনী পাশ। ধর্ষণ মামলায় ভুক্তভোগীর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন করা যাবে না।” “ধর্ষণের শিকার ব্যক্তিকে চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ থাকছে না।” “ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের মামলায় বাদির চরিত্র হনন করা যাবে না।” “ধর্ষণের শিকারের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন নয়, বিল পাশ।” “Rape victim’s character can no longer be questioned.” “JS passes bill to prevent character assassination of rape victims.” “Bangladesh amends colonial law that allowed questioning of rape victim’s character, sexual behaviour.”

২) কিন্তু বাস্তবে তো তা ঘটেনি। ‘সাক্ষ্য আইন সংশোধন ২০২২’ এর ২০ নং ধারায় লেখা আছে ভিকটিমকে তার “সাধারণ চারিত্রিক ব্যভিচারীতা” (general immoral character) এবং “পূর্বতন যৌন আচরণ” (previous sexual behaviour) নিয়ে প্রশ্ন করা যাবে তবে তার জন্য “আদালতের অনুমতি” লাগবে। অর্থাৎ, সরকার ও সাংসদরা অপরাধীকে সদর দরজা দিয়ে বের করে বাহবাহ কুড়িয়ে (চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন করা “নারীর জন্য মর্যাদাহানিকর,” “আইনের চোখে সমতা নীতির পরিপন্থী”) চোরাই পথে ঢুকিয়ে পুনর্বহাল করেছে। নারীর চরিত্রহনন বাতিল করা হয়নি, স্রেফ পাহারাদার (“আদালতের অনুমতি”) বসানো হয়েছে।

৩) আরো উল্লেখ্য যে, ধর্ষণের ভুক্তভোগীর চরিত্র হননের আইনসিদ্ধতাকে বাতিল করার জন্য নারী আন্দোলনের খুব সুনির্দিষ্ট দাবিদাওয়া ছিল। এ প্রসঙ্গে বøাস্টের আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে লিখিত প্রস্তাব উল্লেখযোগ্য: সাক্ষ্য আইনের ৫৩(এ), ১৪৬(৩) এবং ১৫০(এ) ধারাগুলির প্রতিটিতে একটি উপধারা অন্তর্ভুক্ত করা হোক এবং ১৫৫(৪) বাতিল করা হোক (১৭ই নভেম্বর ২০২১)। শুধু ১৫৫(৪) ধারা বাতিল করে সরকারের দাবি যে নারীর চরিত্র নিয়ে আর প্রশ্ন করা যাবে না এদেশের নারী সম্প্রদায়ের সাথে চালাকির নামান্তর।

৪) আরো উল্লেখ্য যে, এদশেরে নারী অধিকার আন্দোলনের দাবি রেইপ শিল্ড ল’ও, যেমনটি আছে পাশর্^বর্তী দেশ ভারতে। ভারতের ২০১৩ সালের আইনে বলা হয়েছে ধর্ষণ মামলার বিচারের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর চরিত্র বা যৌন আচার-আচরণের ইতিহাস সম্পূর্ণরূপে অপ্রাসঙ্গিক। ধর্ষণ ঘটেছিল কি না (সম্মতি ছিল কি ছিল না) এটি বিবেচনা করার জন্য আসামীপক্ষের আইনজীবী জেরাকালে ভুক্তভোগী ভালো মেয়ে না মন্দ মেয়ে, তার পরনে কি ছিল, তার কয়জন প্রেমিক, ভালো মেয়ে হলে এত রাতে কেন একা বেরিয়েছিল – এ ধরনের কোনো প্রশ্ন করতে পারবেন না বা প্রমাণাদি হাজির করতে পারবেন না। একইসাথে, এটিও গুরুত্বপূর্ণ যে, ভারতের সাক্ষ্য আইন ‘নিরঙ্কুশ’, অর্থাৎ, ধর্ষণ মামলায় এমন কোনো পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটতে পারবে না যেটি ব্যতিক্রম বলে বিবেচিত হবে এবং নারীর চরিত্র নিয়ে আকারে ইঙ্গিতে আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে। সেটি বেআইনী।

আমাদের দাবি:-

(ক) ধর্ষণের ভিকটিমের চরিহনন করার বিধান সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা হোক। ‘সাক্ষ্য আইন সংশোধন ২০২২’ পুনরায় সংশোধন করে ভুক্তভোগীর চরিত্র হননের সকল ধারা/উপধারা বিলুপ্ত করা হোক।

(খ) দ্রত রেইপ শিল্ড ল’ তৈরি করে বাস্তবায়ন করা হোক।

(গ) সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে সাংবাদিক ভাই ও বোনদের সরকারি ভাষ্যের উপর নির্ভরশীলতা হ্রাস করানোর উপায় বের করা হোক।

এই তিনটি দাবি নিয়ে শেকল ভাঙার পদযাত্রা গত ২৯শে ডিসেম্বর রাত ১১: ৫৯ মিনিটে শাহবাগ থেকে সাংসদভবন অভিমুখে মশাল মিছিলের আয়োজন করে।



Categories: আন্দোলন বার্তা, বাংলাদেশে নারীবাদ

Tags: ,

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: